বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট চেইনের আড়ালে চলছিল এক ভয়ংকর চক্র! গ্লোবাল ইখওয়ান সার্ভিসেস অ্যান্ড বিজনেস হোল্ডিংস (GISBH, জি আই এস বি এইচ ) নামের সংস্থাটি এতিম শিশুদের দেখভালের কথা বললেও, তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ বাস্তবতা। মালয়েশিয়াতে এক পুলিশি অভিযানে শত শত শিশু উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের অনেকেরই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ কী?
জি আই এস বি এইচ দাবি করত যে, তারা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান, যা এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করে। কিন্তু পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, এই সংগঠনটি মূলত এমন একটি চক্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল, যেখানে শিশুদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হতো এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকারও হতে হতো।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনের নেতারা অনুসারীদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখত, যেখানে তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না এবং বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো। শিশুদের শিক্ষার নামে একচেটিয়া মতবাদ শেখানো হতো এবং সংগঠনের প্রধান নেতাই সব এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো।
শিশু নির্যাতনের ভয়ংকর চিত্র
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এক অভিযানে মালয়েশিয়ার পুলিশ জি আই এস বি এইচ-এর পরিচালিত বিভিন্ন এতিমখানায় হানা দেয়। এই অভিযানে ৬০০-র বেশি শিশু উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসা পরীক্ষায় দেখা যায়, উদ্ধারকৃত শিশুদের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মালয়েশিয়ার পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল রাজারুদ্দিন হোসাইন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, "শিশুদের কেবল শারীরিক নির্যাতনই করা হয়নি, বরং তাদের একে অপরকে যৌন নির্যাতনে বাধ্য করা হয়েছে।"
নেতাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা
অভিযোগ রয়েছে যে, জি আই এস বি এইচ-এর নেতারা এই এতিমখানাগুলোকে অর্থ সংগ্রহের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। সংগঠনের বর্তমান প্রধান নির্বাহী নাসিরউদ্দিন মোহাম্মদ আলী এক ভিডিও বিবৃতিতে স্বীকার করেছেন যে, "এক-দুইটি ঘটনা ঘটেছে, তবে আমাদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা।"
কিন্তু প্রাক্তন সদস্যরা জানিয়েছেন, সংগঠনের নেতারা বিলাসবহুল গাড়ি, ব্যক্তিগত বিমান এবং উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন। তারা সংগঠনের সদস্যদের কঠোর পরিশ্রম করিয়ে কোনো বেতন না দিয়ে শুধু খাবার ও আশ্রয় দিতেন। এমনকি শিশুদেরকেও বিভিন্ন কারখানায় শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো।
প্রাক্তন সদস্যদের মতে, GISBH একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে যেখানে সদস্যদের পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই। সংগঠনের নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল ছিল যেখানে শুধুমাত্র নিজেদের মতবাদ প্রচার করা হতো।
এছাড়া, বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সময় 'পবিত্র জল' ছিটানোর অভিযোগও উঠেছে। এই জল GISBH নেতাদের লালা, চুল ও গোসলের পানির সংমিশ্রণে তৈরি করা হতো বলে প্রাক্তন সদস্যরা জানিয়েছেন। এই পণ্যগুলো সাধারণ জনগণের কাছে বিক্রি করা হতো, যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শিশুদের ভবিষ্যৎ কী?
আদালতের আদেশে এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ শিশু তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে অনেকেই তাদের প্রকৃত বাবা-মাকে চিনতে পারছে না। সামাজিক সেবা সংস্থাগুলো বলছে, এতদিন ধরে সংগঠনের ভেতরে কাটানো জীবন থেকে বেরিয়ে এসে এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
সরকারের পদক্ষেপ
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং পুলিশ ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে, জি আই এস বি এইচ-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/আশিক