মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম আবাসন। আবাসন সংকট নিয়ে রাজধানীবাসী প্রায় সবাই ভুক্তভোগী। কারও নিজের জমি থাকার পরও সেই জমিতে বাড়ি করার মতো টাকা থাকে না। নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট করার স্বপ্ন অধরা থেকে যায় অনেকের। যারা কম বেতনে চাকরি করেন বা স্বল্প পুঁজির ব্যবসা করেন তাঁরা নিজের একটি আবাসন স্বপ্ন পূরণ অসম্ভব মনে করেন। রাজধানীর বুকে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার বাস্তবতা অনেক কঠিন মনে করেন। এসব মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের স্বপ্ন পূরণ করে দিচ্ছে। একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট নয়, শহুরে মধ্যবিত্তের আরেক স্বপ্ন গাড়ি। রাজধানীর পাবলিক বাসে চড়ার হয়রানি থেকে মুক্ত হতে নাগরিক চাহিদার অন্যতম গাড়ি। এ স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে গ্রাহককে সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে দেশের প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। একটা সাধারণ মানের গাড়ি কেনা এখন অনেকের জন্যই কোনো বিলাসিতা নয়; বরং প্রয়োজন। তাই গ্রাহকদের প্রয়োজন বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও আমাদের ব্যাংকের পলিসি অনুসরণ করে গ্রাহকদের সুবিধাজনক শর্তে গাড়ি কিনতে ঋণ দেয় সব ব্যাংক।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। গৃহঋণ দেয় সরকারি ব্যাংক, অনেক বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে আবাসন ও গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়ার জন্যই গড়ে উঠেছে বেসরকারি কিছু কোম্পানি। ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রাইম ব্যাংক, আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসি সহজ শর্তে এ ঋণ দিচ্ছে গ্রাহকদের।
গ্রাহকদের ব্যাংক অথবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা নিজের থাকতে হয়। কেউ যদি ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনতে চান সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়। বাকি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ক্রেতার নিজের থাকতে হয়। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি ঋণ দিয়ে থাকে। তারা ফ্ল্যাটের দামের পুরো টাকাই ঋণ দিতে পারে। গৃহ নির্মাণের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানভেদে এ হিসাব ভিন্ন হয়ে থাকে। বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ নিতে হলে বয়স বিবেচনা করা হয়। সাধারণত ঋণ পেতে হলে ঋণগ্রহীতার বয়স ২৫ থেকে ৬৫ বছর হতে হবে। চাকরিজীবীদের মাসিক আয় হতে হবে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা। ঋণ নেওয়ার এ সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ী এবং বাড়িওয়ালারাও। অনেকে মনে করেন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে গেলে কাগজপত্রজনিত জটিলতা পোহাতে হয়। ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ব্যাংকগুলো আলাদা উইন্ডো করে বিশেষ সেবা দিয়ে থাকে। সাধারণ কিছু নিয়ম ও কাগজপত্র সঠিকভাবে নিয়ে সহজ শর্তে যে কোনো ঋণ পাওয়া যায়। ফ্ল্যাট বা জমির ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত ক্রয়ের রেজিস্ট্রি করা চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি দিতে হবে। লাগবে জমির মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি এবং অনুমোদিত নকশা ও অনুমোদনপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। ফ্ল্যাট কেনার রেজিস্ট্রি করা বায়না চুক্তিপত্রের মূল কপি এবং বরাদ্দপত্র লাগবে। বাড়ি নির্মাণ ঋণের জন্য প্রথমেই দরকার যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার সত্যায়িত ফটোকপি, মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান এবং খাজনা রসিদের সত্যায়িত ফটোকপি। আরও লাগবে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস খতিয়ানের সত্যায়িত কপি। এ ছাড়া লাগবে জেলা বা সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে ১২ বছরের তল্লাশিসহ নির্দায় সনদ (এনইসি) এবং সরকার থেকে বরাদ্দ পাওয়া জমির ক্ষেত্রে লাগবে মূল বরাদ্দপত্র ও দখল হস্তান্তরপত্র। ফ্ল্যাট বা জমি কেনার সময় অনেকেই মর্টগেজ ঋণ বা বন্ধকি ঋণ নিয়ে থাকেন। ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থায়ী সম্পদ জামানত রেখে তার বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করাকেই বলা হয় বন্ধকি ঋণ। এ ঋণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদের জন্য নেওয়া হয়। যার মেয়াদকাল ৫ থেকে ২০ বছর কিংবা তার বেশি হতে পারে। মর্টগেজ লোনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কাছে স্থায়ী সম্পদ জামানত হিসেবে রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত জামানত হচ্ছে জমির দলিল। অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বা কোনো স্থায়ী সম্পদ কেনার উদ্দেশ্যে মর্টগেজ লোন নিয়ে থাকে। মর্টগেজ লোন নিতে প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনের সময় কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণে বা গাড়ি কেনার জন্য বেসরকারি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গৃহঋণ দিচ্ছে ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে। ফ্ল্যাট ও বাড়ি নির্মাণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যায় গ্রামাঞ্চলে বাড়ি নির্মাণে। তবে অন্য ঋণ পণ্যে সুদের হার ৯ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের সুদ বেশি। এদের সুদের হার ব্যাংকভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। তবে কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহক বুঝে সুদের হার ৯ শতাংশও রাখছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে গাড়ি কেনার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৫-২০২৪) দেশে গাড়ি বিক্রির হার প্রায় ৮-১০% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ২৫,০০০ নতুন গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানতে চাইলে এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাধারণভাবে ধরা হয় একটি গাড়ির ওয়্যার অ্যান্ড টিয়ার অনেক বেশি। ব্যাংকগুলো যেহেতু সর্বোচ্চ ছয় বছর মেয়াদে গাড়ি কেনার লোন দিয়ে থাকে; তাই নতুন বা রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনার জন্যই ব্যাংকগুলো লোন দিতে আগ্রহী। আমরা সর্বদা চেষ্টা করি সুদের হারকে বাজারের প্রতিযোগিতামূলকভাবে গ্রাহকদের জন্য সহনীয় ও বহনযোগ্য পর্যায়ে রাখতে। তবে এটি বাজার ও অন্যান্য কিছু নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল।
মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান উজ জামান বলেন, দেশের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি আবাসন ঋণের প্রতি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বেশি। কারণ সাধারণত গ্রাহকরা ব্যক্তি বাসস্থান নির্মাণ বা ক্রয়ের জন্য বেশি ঋণ গ্রহণ করেন। তবে যৌথ আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোর আগ্রহ রয়েছে। কারণ এতে দেশের বৃহৎ আবাসন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। আমাদের ব্যাংক আবাসন খাতে মোট ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ করে থাকে। এটি আমাদের ঋণ পোর্টফোলিওর একটি প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের ব্যাংক গ্রাহকের সুবিধার কথা বিবেচনা করে গাড়ি কেনার জন্য সহজ শর্তে কার লোন প্রদান করে। যেমন- নতুন গাড়ি কেনার পাশাপাশি আমরা ব্যবহৃত গাড়ি ক্রয় করার জন্যও গ্রাহককে ঋণ সুবিধা প্রদান করে থাকি। শুধু প্রচলিত ঋণই নয়, আমরা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যবস্থাও রেখেছি আমাদের গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে।