পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি অনেকেই মনোযোগী। প্রত্যেক মুসলমান চেষ্টা করে সামান্য পরিমাণ হলেও তিলাওয়াত করার। কেউ দিনে একবার তিলাওয়াত করে, কেউ সপ্তাহে একবার তিলাওয়াত করে আবার কেউ মাসে কয়েকবার তিলাওয়াত করে। কিন্তু তিলাওয়াতের সঙ্গে সঙ্গে কোরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে খুব কম লোকই।
অথচ কোরআন নিয়ে গবেষণার তাগিদ দেওয়া হয়েছে কোরআনের একাধিক স্থানে। কোথাও বলা হয়েছে, ‘তবে কি তারা কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে আসত তবে তারা তাতে অনেক অসংগতি পেত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮২)।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে কি তারা কোরআন সম্পর্কে অভিনেশসহ চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)।
কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার নির্দেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, যদিও শুধু কোরআন তিলাওয়াতই সওয়াব লাভের মাধ্যম, তবু আল্লাহ চান বান্দা যেন কোরআনের অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে এবং সে অনুসারে আমল করে। প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, কোরআন চিন্তাশীল মানুষের জন্য আয়নাস্বরূপ, যাতে সে নিজের ভালো-মন্দ দেখতে পারে। এরপর চাইলে কোরআনের আলোকে নিজেকে সংশোধন করতে পারে।
কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনার একটি রূপ এমন হতে পারে যে তিলাওয়াতকারীর সামনে যখন রহমতের আয়াত আসে তখন সে থেমে যায়। আল্লাহর অঙ্গীকারের কথা ভেবে খুশি হয় এবং তাঁর কাছে রহমত প্রার্থনা করতে থাকে। আর যখন সে শাস্তির আয়াত পড়ে, তখন তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করে।
শাস্তি যদি অবিশ্বাসীদের ব্যাপারে হয়, তবে নিজের ঈমানের স্বীকৃতি দেবে এবং কালেমা পাঠের মাধ্যমে ঈমান নবায়ন করবে। পাশাপাশি যেসব বিষয় আল্লাহর শাস্তি ডেকে আনে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। সর্বোপরি আল্লাহর কাছে শাস্তি থেকে পরিত্রাণ চাইবে।
আয়াতে মুমিনদের সম্বোধন করা হলে দেখবে কোন বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোন বিষয় থেকে নিষেধ করা হয়েছে। যদি আদিষ্ট বিষয়ে আমল করার ক্ষেত্রে বা নিষিদ্ধ বিষয় ত্যাগ করার ব্যাপারে কোনো অপূর্ণতা থাকে, তবে বিনীত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
যখন তিলাওয়াতকারী এই আয়াত পড়বে- ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং নিজ পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
তখন নিজ পরিবারের দ্বিনদারির প্রতি লক্ষ করবে। তাদের নামাজ-রোজা, পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা, পর্দা-শালীনতা যাচাই করে দেখবে। তাদের ভেতর কোনো অপূর্ণতা থাকলে শিক্ষা ও স্মরণের মাধ্যমে সংশোধন করে দেবে। কোনো আয়াত বুঝে না এলে প্রাজ্ঞ আলেমদের দ্বারস্থ হবে। পূর্ববর্তী জাতির বর্ণনা পাঠ করলে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা পাঠ করবে। কেননা তিনি আমাদের পাপের জন্য পৃথিবীতে শাস্তির মুখোমুখি করেননি। পূর্ববর্তী জাতিকে আল্লাহ যেসব অনুগ্রহ করেছিলেন তা পাঠের সময় তিলাওয়াতকারী সেগুলো প্রার্থনা করবে।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাদের জন্য কোরআনের জ্ঞান উন্মুক্ত করে দেন, যারা কোরআনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে। তাই কোরআন তিলাওয়াতের সময় আদব ও শিষ্টাচার রক্ষা করা আবশ্যক। যেমন- অজুর সঙ্গে তিলাওয়াত করা, সুযোগ থাকলে কিবলামুখী হয়ে তিলাওয়াত করা, হাসিঠাট্টা থেকে বিরত থাকা, তিলাওয়াতের জন্য উত্তম সময় ও উত্তম স্থান নির্বাচন করা।
মূলত কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর পরিচয় লাভ করে এবং মানুষের দাসত্বের মর্ম বুঝতে পারে। এর দ্বারা গবেষকরা প্রকৃত বিষয় জানতে পারে এবং ভিত্তিহীন বিষয় থেকে বাঁচতে পারে। কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা দ্বিনের ব্যাপারে মানুষের অন্তরের সন্দেহ-সংশয় দূর করে।
কোনআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনার আরো উপকার হলো প্রবৃত্তি নিবৃত্ত হয়, ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যায়, মন্দ ইচ্ছা লোপ পায়, সুপথ লাভ ও দ্বিনের ওপর চলার তাওফিক হয়, অন্তরে স্বস্তি ও প্রশান্তি আসে, শয়তানের প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা থেকে বাঁচা যায়। আর মহান আল্লাহ কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনাকারীদের আলোচনা ফেরেশতাদের মর্যাদাপূর্ণ মজলিসে করে থাকেন।
তথ্য সূত্র : তামিরে হায়াত থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ