৫৬ ভাগ মানুষ মনে করে জনপ্রশাসনকে জনবান্ধব করার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’। এ ছাড়াও বিগত ১৫ বছরে জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতার অভাব ছিল এই ধারণা ৬৮ দশমিক ৮ ভাগ নাগরিকের। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মন্ত্রিপরিষদের ওয়েবসাইটে ২০৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
কমিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নাগরিকদের মতামত নিতে উদ্যোগ নেয় কমিশন। সে ক্ষেত্রে প্রথমে জনপ্রশাসনের মূল সমস্যাগুলো শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এ কারণে বিভিন্ন বিষয়ে অনলাইনে নাগরিকদের মতামত সংগ্রহের জন্য এক জরিপ পরিচালনা করে। ১ লাখ ৫ হাজার নাগরিক বিভিন্ন প্রশ্ন সম্পর্কে তাঁদের মতামত দেন। নির্ধারিত প্রশ্নের বাইরে উন্মুক্তভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। নাগরিকদের মতামতে আরও উঠে এসেছে ৮৪ দশমিক ৪ ভাগ নাগরিক মনে করেন, দেশের জনপ্রশাসনে সংস্কার প্রয়োজন। ৮০ ভাগ লোক মনে করেন, দেশের জনপ্রশাসনব্যবস্থা জনবান্ধব নয় এবং ৪২ ভাগ ব্যক্তি মনে করেন দুর্নীতিই হচ্ছে প্রধান বাধা।
এ ছাড়াও ৫২ ভাগ উত্তরদাতার মতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রধান কাজ। ৩৬ ভাগের মতে, দুর্নীতি দূর করতে পারা হচ্ছে আসল কাজ। প্রায় ৯৬ ভাগের অভিজ্ঞতা হচ্ছে জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। ৬৬ দশমিক ৪ ভাগ নাগরিক মনে করেন, সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের সঙ্গে শাসকের ন্যায় আচরণ করেন। ৫২ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন, ঘুষ ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যায় না এবং ৪৬ ভাগের মতে তাঁরা সেবা চাইতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। প্রায় ৭৬ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন, বিদ্যমান উপজেলাপদ্ধতি শক্তিশালী করে ভালো সেবা পাওয়া যেতে পারে। ৬৮ ভাগ উত্তরদাতার মতে, বিদ্যমান জেলা পরিষদব্যবস্থা মোটেই কার্যকর নয়। ৪৭ ভাগ মানুষ মনে করেন, বিদ্যমান ইউনয়িন পরিষদ ও পৌরসভাকে শক্তিশালী করে জনপ্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ৫৭ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন, এমন কঠোর আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে সরকারি কর্মচারীরা রাজনৈতিক চাপে প্রভাবিত না হয়। ২৩ ভাগ উত্তরদাতা মনে করেন, জনপ্রশাসনে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যাপক প্রসার সমতাভিত্তিক সেবা প্রদানের সহায়ক হতে পারে। ৪ ভাগ নাগরিক মনে করেন, বেতন ও সুযোগসুবিধা বাড়ালে ঘুষ-দুর্নীতি কমে যেতে পারে। সেবাগ্রহীতাদের প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, কমিশন নাগরিক পরিষেবাসম্পর্কিত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে যাওয়া সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে এক জরিপ পরিচালনা করে। দপ্তরগুলো ছিল- তহশিলদার অফিস, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সেটেলমেন্ট অফিস, পুলিশের দপ্তর, আয়কর অফিস, পৌরসভা/সিটি করপোরেশন অফিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল ও স্বাস্থ্যসেবা। ৫ হাজার ২৩৩ জন নাগরিক বিভিন্ন প্রশ্ন সম্পর্কে তাঁদের মত প্রদান করেন। তহশিল অফিস, সহকারী কমিশনানের (ভূমি) অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সেটেলমেন্ট অফিসে ৪৩ দশমিক ৪২ ভাগের মতে, ঘুষ দিতে হয়েছে। ১০ দশমিক ১৩ ভাগ সেবাগ্রহীতা ওই সব অফিসে গিয়ে দুর্ব্যবহার ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছেন।
প্রায় ৫০ ভাগ সেবাগ্রহীতা জানান পুলিশে ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া কাজ হয় না। মাত্র ১৫ ভাগ সেবাগ্রহীতা ভালো বলেছেন, তাঁরা থানায় ভালো ব্যবহার পেয়েছেন এবং ১৯ ভাগ সেবাগ্রহীতা বলেছেন, তাদের পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন সহজেই সম্পন্ন হয়েছে। ৪ ভাগ সেবাগ্রহীতা বলেছেন, থানায় গিয়ে সঠিকভাবে জিডি করতে পেরেছেন।
আয়কর অফিসে প্রায় ৪২ ভাগ সেবাগ্রহীতা ঘুষ ও দুর্নীতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং ১০ ভাগ হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁরা ওই অফিসে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন। পৌর ও সিটি করপোরেশন অফিসে ৩২ ভাগ সেবাগ্রহীতা দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি এবং ২৭ দশমিক ৭৫ ভাগ ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রায় ১৩ ভাগ উত্তরদাতা হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংশ্লিষ্ট অফিসে প্রায় ৪২ ভাগ সেবাগ্রহীতা এসব সংস্থার সেবা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রায় ১০০ ভাগ সেবাগ্রহীতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ৩৬ ভাগ সেবাগ্রহীতা বলেছেন, তাঁরা নিম্নমানের সেবা পেয়েছেন এবং ওষুধ পাননি জানিয়েছেন প্রায় ১২ ভাগ সেবাগ্রহীতা।
এসব সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। এ ছাড়াও এবারের কমিশন একটি স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন সংস্কারের কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর কিছু বিষয় স্বল্পমেয়াদি, কিছু বিষয় মধ্যমেয়াদি এবং কিছু বিষয় দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে হয়। বিভিন্ন সরকারের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে কোনো কোনো সংস্কার কার্যক্রমে শ্লথগতি বা পরিবর্তন আসতে পারে। এ ছাড়া জনপ্রশাসনে নতুন নতুন উদ্ভাবন প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকা উচিত, নতুবা জনপ্রশাসন তার গতি হারাতে পারে। এ কারণে একটি স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করার কথা বলেছেন তাঁরা। কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে নাগরিক সেবা বাড়ানো, আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য বিষয়গুলো উঠে এসেছে। দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে বিস্তারিত সুপারিশ করে কমিশন। দুটির জন্য আলাদা কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়াও সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি প্রদেশে ভাগ করা, ভারতের নয়াদিল্লির আদলে রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জকে নিয়ে একটি ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে পৃথক করে আরও দুটি বিভাগ করার সুপরিশ করা হয়েছে। এত মন্ত্রণালয় না রেখে তা কমানোর সুপারিশও রয়েছে রিপোর্টে।