উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি নেই, কিন্তু দেদার বাড়ছে অনুন্নয়ন ব্যয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস, অর্থাৎ জুলাই-অক্টোবর মেয়াদে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ৩০ হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই ব্যয়কে সরকারের আর্থিক বিশৃঙ্খলার একটি উদাহরণ উল্লেখ করে বলছেন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক না হলে সামনের দিনগুলোতে সমস্যা আরও বাড়বে।
সরকারের বাজেট বিশৃঙ্খলার এ বিষয়টি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বাধীন পর্যালোচনায় (আইআরবিডি) উঠে এসেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর মাসে অনুন্নয়ন বাজেটের ব্যবহার ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে অনুন্নয়ন বাজেটের ব্যবহার ছিল ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অপরদিকে জুলাই-অক্টোবর সময়কালে উন্নয়ন বাজেটে (এডিপি) বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি ব্যয় ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এর অর্থ হলো, সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয় কমছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয় বাড়াতে সহায়তা করলেও অনুন্নয়ন ব্যয় সরকারের ঋণ, সুদ হার, বাজেটঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে ঋণের সুদ পরিশোধের কারণে। যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে এটা ক্রমাগত বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস্য থেকে ঋণ গ্রহণ এবং ঋণের অর্থ ব্যবহারেও আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। না হলে, সরকারের আর্থিক খাতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
উন্নয়ন ব্যয় কমার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে সিপিডি তার স্বাধীন পর্যালোচনায় বলেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল; পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পুনঃপ্রাধান্য নির্ধারণ এবং পুনর্মূল্যায়নের কারণে এডিপি বাস্তবায়ন কমেছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন সংস্থায় কর্মকর্তাদের রদবদল ঘটিয়েছে। প্রশাসনে পুনর্গঠনও এই পরিস্থিতির পেছনে অবদান রেখেছে।
চার মাসে অতিরিক্ত ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় : সরকার বাজেটে ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, সেটি ভেঙে গেছে। সিপিডি বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর মেয়াদে বাজেটে উন্নয়নবহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অনুন্নয়ন ব্যয় মূলত সরকারের প্রশাসনিক ব্যয়, ঋণের সুদ পরিশোধ, প্রণোদনা ও ভর্তুকিতে ব্যয় হয়। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও অনুন্নয়ন ব্যয় হয়ে থাকে। গত চার মাসে যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে তার বেশির ভাগই গেছে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে। এ সরকারের প্রণোদনার কারণেও ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়লেও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়েনি; যা বাজেটঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-অক্টোবর সময়কালে মোট রাজস্ব আদায়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে, যার অর্থ হলো বার্ষিক লক্ষ্য অর্জন করতে হলে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়কালে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
সরকারের আয়-ব্যয়ের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটির স্বাধীন পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, যেসব প্রকল্প শেষের দিকে রয়েছে (৮৫ শতাংশ বাস্তবায়িত) সেগুলো চলতি অর্থবছরে সমাপ্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, এগুলো দ্রুত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তৈরিতে অবদান রাখতে পারে। এ ছাড়া উন্নয়ন ব্যয় থেকে অ-উৎপাদনশীল উদ্যোগ বাদ দেওয়ার অনুশীলন অব্যাহত রাখা উচিত। একই সঙ্গে সরকারের আয় বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ ও কর ফাঁকি সীমিত করার উদ্যোগে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যাতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ভিত্তি তৈরি করা যায় এবং রাজস্ব ফাঁকি কমানো যায়।