‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে নিজের ভাষা বাংলাকে ছড়িয়ে দিতে পারাটা গৌরবের।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখানোটা নিজের জন্যও দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি ভালোবাসার মতো কাজ’ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক শারমিন সুলতানা। গতকাল এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা শেখানোর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা জানান এই শিক্ষক।
তিনি বলেন, ভাষার জন্য এ জাতি জীবন বিপন্ন করেছে নির্দ্বিধায়। এ জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তিই ছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের ভিতর। সেই জাতিসত্তার একজন অস্তিত্বসচেতন মানুষ হিসেবে আমি ভাষাকে নিজের পরিচয় মনে করি ও নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি মনে করি। আমার কাছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখানোর কাজটি দেশপ্রেম প্রদর্শনের অনন্য উপায়, যার মাধ্যমে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশকে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করতে পারছি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মর্যাদার সঙ্গে দেশের কথাকে পৌঁছে দিতে পারছি। বাংলা ভাষার শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতায় আমি বাঙালি জীবনের সার্থকতা দেখতে পাই।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখাতে গিয়ে বাংলাকে আরও ভালোভাবে জানা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন সচেতন বাঙালি হিসেবে বিদেশিদের শিক্ষক হওয়ার সুযোগে আমি বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দিতে গিয়ে মূলত বাংলা ভাষা কোন কোন জায়গায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ভাষা থেকে স্বতন্ত্র, তা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করি। যেহেতু আমরা ভিন্ন ভিন্ন জীবনধারার ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে শিক্ষার্থী হিসেবে পাই, সেহেতু বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র পরিচয় স্পষ্টত ধরা পড়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের শেখাতে গিয়ে। আমি যে বিষয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবগত হয়েছি, সেগুলো হলো স্বতন্ত্র উচ্চারণ কাঠামো, শব্দের ব্যবহারগত বিন্যাস, বর্ণমালার সংখ্যাগত ধারণা ও গঠনগত বিন্যাস, ভিন্ন দেশের লেখার স্বতন্ত্র ধারা, শব্দের দ্ব্যর্থকতাজনিত ধারণা, আমাদের বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনিগুলোর সঙ্গে অন্যান্য দেশের ধ্বনিগত সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য ইত্যাদি। এ ধরনের তথ্য, পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য নিরূপণ বিষয়ক গবেষণাকর্মে উদ্বুদ্ধ করছে আমাদের।
ভাষা শেখানোর সময় বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ নিয়ে মনোভাব ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা যায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ভাষাগত জ্ঞানের পাশাপাশি আমি বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জানতে পারি তার বা তাদের দেশ বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ধরনের জ্ঞান বা ধারণা রাখেন বা রাখে, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের ও তাদের দেশের আগ্রহের জায়গাটি কতটা ইতিবাচক, তাও উঠে আসে আমাদের সামনে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যে খুবই ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, সেটিও জানতে পারি, যা বিশ্বের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমি জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত অর্থনীতির দেশের মানুষের কাছ থেকে জানতে পারি, তারা বাংলাদেশকে তাদের দেশে পরিচিত করতে বিশেষভাবে আগ্রহী। তারা কেউ কেউ এ দেশে থেকে তাদের পারদর্শিতা প্রদর্শন করে দুই দেশের সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ায় জীবন অতিবাহিত করতে চান।
বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলা কেন শিখছে এবং এ নিয়ে তাদের পরিকল্পনা বিষয়ক আলোচনায় কিছু চমৎকার বিষয় উঠে এসেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তারা অনেকেই এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, কর্মপন্থা, জীবনাদর্শ ইত্যাদি তাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ নিজ দেশে গিয়ে বাংলা ভাষার শিক্ষক হতে চান, যা বিশ্বে বাংলা ভাষার অবস্থান, চাহিদা ও প্রসার সম্পর্কিত ইতিবাচক ধারণা দেয়। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশকে ভালোবেসে বাংলাদেশে শিক্ষকতা করতে চান, যা আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কোনো কোনো শিক্ষার্থী বাংলা শিখে বাংলাদেশের মানুষকে সে দেশের ভাষা শেখাতে চান, যেন বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি তাদের দেশে গিয়ে কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হবে বলে আশা রাখি।
বাংলা ভাষার প্রসারে করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বাংলা বানান ও উচ্চারণ বিধির সমন্বিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। যা বাংলা ভাষার ভুল প্রয়োগ সংশোধনের পাশাপাশি বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে বলে মনে করি। সর্বশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কনফারেন্স বা সভার আয়োজন করা হলে তা নতুন নতুন গবেষণাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে একে আমাদের বাংলা ভাষার বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনার সাাক্ষী করে রাখা যেতে পারে।