ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। বিরোধী দলগুলো, ছাত্রনেতারা, ইসলামি দলগুলো ও গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য শক্তি নির্বাচনি সুবিধা আদায়ে তৎপর। বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর দেখভালের পাশাপাশি যুদ্ধকবলিত মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তের অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
গতকাল ‘বাংলাদেশ : গণতান্ত্রিক উত্তরণে উভয় সংকট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি। কোথায় শান্তির সম্ভাবনা বাড়াতে পারে, তা চিহ্নিত করে প্রতি বছর ‘ইইউ পর্যবেক্ষণ তালিকা’ প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। এ বছরের তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ইউক্রেন, সিরিয়া, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশের নাম রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসিনার আওয়ামী লীগ তার দীর্ঘ শাসনকালে রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় অংশে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। হাসিনার পতনের পরপর অন্তর্বর্তী সরকার যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল, তা ম্লান হতে শুরু হয়েছে এবং অধ্যাপক ইউনূস এখন অভ্যুত্থানের সুনির্দিষ্ট ফলাফল দেখানোর জন্য চাপের মুখে পড়ছেন। সরকার শুধু যে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে মতপার্থক্য দূর করার সংগ্রাম করছে তা নয়, দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা নিয়েও লোকজনের সমালোচনার শিকার হচ্ছে তারা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারের চাপের মধ্যে অন্যতম হলো নতুন জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা। ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ওপর চাপ ক্রমে বাড়ছে। নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণার বাইরেও নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নির্বাচন-পরবর্তী সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। উচ্চাকাক্সক্ষী সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সব কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কোন সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, কোনগুলো বাদ দেওয়া হবে বা ভবিষ্যতের সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হবে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন আদায়ের ওপর নির্ভর করছে এ প্রক্রিয়ার সাফল্য।
সংস্থাটি আরও জানায়, রাজনৈতিক জটিলতা ছাড়াও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ব্যাপক দুর্নীতি, আর্থিক খাতে তার সঙ্গী-সাথিদের লুটপাট নিয়ে সৃষ্ট অসন্তোষ রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে অপতথ্য ও প্রতিবেশীর উদ্বেগ মোকাবিলার বিষয়ও। দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে এ সরকারকে। অভিযোগের অধিকাংশ আসছে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভারতের কাছ থেকে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ ও হাসিনার একনিষ্ঠ সমর্থক।
প্রতিবেদন নিয়ে ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার ও বাংলাদেশবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট থমাস কিয়ান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ সংস্কার নিয়ে দরকষাকষি করায় এবং নির্বাচনি সুবিধার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায় এ বছর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে। নির্বাচনি রাজনীতিতে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার প্রক্রিয়ায় সমর্থন ও অন্তর্বর্তী সরকার যাতে দেশকে একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়, সেটা নিশ্চিত করতে আলাপ-আলোচনা, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে বিদেশি অংশীদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।