গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও জনজীবন এবং ব্যবসাবাণিজ্যে স্বস্তি আনার মতো কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। গতকাল ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৪-২৫ : সংকটময় সময়ে প্রত্যাশা’ পূরণের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর ধানমন্ডিতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিপিডি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। স্বাগত বক্তব্যে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আমরা এখন পর্যন্ত অর্থনীতিতে তেমন কোনো চাঞ্চল্য দেখছি না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর অনেক খাতভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে। অর্থনীতিকেন্দ্রিক কিছু সংস্কার আমরা লক্ষ্য করছি। তবে এখন পর্যন্ত জনগণের জীবনে কিংবা ব্যবসাবাণিজ্যের অঙ্গনে স্বস্তি আনার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো স্টেকহোল্ডার লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি তাৎক্ষণিক এবং মধ্যবর্তী প্রভাব বিবেচনা করে একটি ত্রিমুখী অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা উচিত। প্রথমেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা, যাতে তারা অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে পুনরুদ্ধারে কিছুটা অবকাশ পায়। দ্বিতীয়ত, বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জগুলো একত্রে মোকাবিলা করা। তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলোকে শক্তিশালী করার জন্য সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ এবং তা টেকসই করা অর্থাৎ সংস্কার কর্মসূচিকে চলমান রাখা। ফাহমিদা খাতুন বলেন, অভ্যুত্থানের আর্থসামাজিক অবস্থার মধ্যে ধাক্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ৪৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। তিনি বলেন, কর আহরণে নেতিবাচক প্রবণতা দেখছি। কর আহরণ বাড়াতে সরকার সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন করের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কথা বিবেচনা করে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে স্বল্প এবং নির্ধারিত আয়ের মানুষের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবর পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন (এডিপি) ৬ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বর অথবা ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সরকার বেশি দিন থাকতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন চায় তারা। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল কারণ ছিল কর্মসংস্থানের অভাব। বিগত সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছিল। সমাজে বৈষম্য বেড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে কর্মসংস্থান বাড়াতে পারেনি। সিপিডি বলছে, বিদেশি ঋণের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। অভ্যন্তরীণ উৎসে নির্ভরতা বাড়ছে, যা আগামীতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শেষ কয়েক বছরে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমজীবী মানুষ বিদেশ গেছে কাজের সন্ধানে। এ ৪০ লাখ শ্রমজীবী মানুষের একটা বড় অংশ থাকে মধ্যপ্রাচ্যে। তবে রেমিট্যান্সে সেটার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক ধরনের ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে। সিপিডি জানায়, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনের নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে সাহসী ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৪টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণে দামের ওঠানামা এবং অদক্ষতার জন্য বেশ কিছু বাধা দেখা গেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মজুতদারি, কমিশন এজেন্ট বা গুদাম পরিচালনাকারীদের আধিপত্য, অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি পদ্ধতি, উচ্চ উপকরণ খরচ, নিম্নমানের সংরক্ষণ এবং পরিবহন সুবিধা এবং সামগ্রিক সরবরাহকে প্রভাবিত করছে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষ যখন মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট সরকার ঠিক তখন ভ্যাট বাড়াচ্ছে। মজুরির তুলনায় দ্বিগুণ মূল্যস্ফীতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সুযোগ এসেছিল, প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটেনি। তারা পরোক্ষ করের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জনগণ যে কর দেয়, সরকার পুরোপুরি পায় না। সরকারের সুযোগ ছিল এসব জায়গায় হাত দেওয়ার, কিন্তু দেয়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেনি ভ্যাট বাড়াতে। তারা বলেছে যে কোনো উপায়ে রাজস্ব বাড়াতে। কিন্তু সরকার প্রত্যক্ষ কর না বাড়িয়ে পরোক্ষ কর বাড়াচ্ছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ২৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নথি চেয়ে সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিল সিপিডি। তবে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে এই যুক্তি তুলে ধরে ২৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তথ্য অন্তর্বর্তী সরকার দেয়নি বলে অভিযোগ করেন ফাহমিদা খাতুন।