দীর্ঘদিন ধরে কাশির সমস্যায় ভুগছেন আলীম কবির। কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় রাজধানীর শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন তিনি। পেশায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালক আলীম বলেন, ‘আমি প্রায় দেড় বছর ধরে ঢাকায় মোটরসাইকেল চালাই। আমার হঠাৎ শুষ্ক কাশি ও গলাব্যথা দেখা দেয়। এরপর কাশি উঠলে বুক চেপে আসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এজন্য চিকিৎসকের কাছে এসেছিলাম। পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক কিছু ওষুধ দিয়েছেন এবং মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে বলেছেন। ধুলাবালির কারণে আমার এ অবস্থা হয়েছে বলে জানিয়েছেন।’ শুধু আলীম কবিরই নন, শ্যামলী ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, শীতের ধুলায় কাশি, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমার সমস্যা নিয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছে রোগী। হাসপাতালসূত্রে জানা যায়, তিন মাস আগে এ হাসপাতালের আউটডোর ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ২০০-৩০০ রোগী দেখতেন চিকিৎসকরা। এখন সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০-তে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ‘ঋতু পরিবর্তন এবং বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধুলাবালি, হাঁচি, কাশি এবং অ্যাজমা বেড়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে ৮০ শতাংশ রোগী অ্যাজমা, অ্যালার্জিজনিত চর্মরোগ, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসেন, যার বেশির ভাগই ধুলোর কারণে হয়। মাস্ক ব্যবহার করলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে রোগের ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।’ বছরের পর বছর ধরে রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের শীর্ষ তালিকায়। বিশেষ করে শীতে ঢাকার বায়ুমান আরও খারাপ হয়। গতকাল ছুটির দিনে রাস্তায় যানবাহনের উপস্থিতি কম থাকলেও বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’-এর বায়ুমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে মাত্রা ছিল ২০৮। একিউআই অনুযায়ী, বায়ুর মানমাত্রা ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে হলে বায়ু খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-এর বেশি হলে চরম অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘ধুলাবালিকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই না কিন্তু এটি নীরব ঘাতকের ভূমিকা পালন করে। ধুলাবালি বায়ুদূষণের প্রধান উপাদান। ধুলাবালির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে নানা ভারী ধাতব ও ক্ষতিকর পদার্থ শ্বাসতন্ত্র দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ হাঁচি, কাশি, ক্রনিক কফ, দীর্ঘদিন কাশি, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা ও দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো রোগের সৃষ্টি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারী ধাতু যেমন ফুসফুসের ক্ষতি করে তেমন ফুসফুস দিয়ে এটি শরীরের রক্তে প্রবেশ করে লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ধুলার কারণে হার্টেরও রক্ত সরবরাহ বিঘিœত হয়। রাস্তার পাশের খোলা খাবারে ধুলাবালি পড়ে। সেসব খাবার খেলে ফুড পয়জনিং, পাকস্থলীর বিভিন্ন রোগ, শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়।’ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক পালমোনলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গে ধুলাবালির সরাসরি সম্পর্ক আছে। ধুলাবালির কারণে অ্যাজমা রোগীদের কষ্ট বেড়ে যায়। শিশুদের ব্রংকিওলাইটিস, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, যক্ষ্মা এসব রোগ ধুলাবালির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমাদের অ্যাজমা সেন্টারে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডাস্ট অ্যালার্জি ও অ্যাজমা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে।’