হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। সাধারণ যাত্রী, প্রবাসী থেকে শুরু করে ভিআইপি-সিআইপি যাত্রীদেরও নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। গত বুধবার রাতে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নরওয়ের চারজন এবং বাংলাদেশের এক নাগরিককে হেনস্তা করার মধ্য দিয়ে হয়রানির চিত্র ফুটে উঠেছে।
হয়রানির হাজারো অভিযোগ নিয়ে একের পর এক বৈঠক, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল অ্যাভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা বিভাগগুলোর নানামুখী তৎপরতায়ও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। যারা যাত্রীদের হয়রানিমুক্ত করার দায়িত্বে নিয়োজিত তারাই উল্টো যাত্রী হয়রানির ঘটনা ঘটাচ্ছেন। কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেরিয়ে আসার মুহূর্তেও দেশে ফেরত বিজনেস ক্লাস যাত্রীদের আটকে দেওয়া হয় নানা অজুহাতে। জানা গেছে, গত বুধবার রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নরওয়ের চারজন এবং বাংলাদেশের এক নাগরিককে হেনস্তা করা হয়। এর মধ্যে নরওয়ের একজনকে মারধর করে রক্তাক্ত করা হয়েছে। বিমানবাহিনীর কুইক রেসপন্স ফোর্স (কিউআরএফ) এবং আনসার বাহিনীর সদস্যরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিমানবন্দরের আগমনি ক্যানপি-২ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর একটি সূত্র জানায়, মারধরের শিকার যাত্রীর নাম মোহাম্মদ সাইদ উদ্দিন। অন্য চারজন হলেন সাইদের বাবা গিয়াস উদ্দিন, মা বেগম মনোয়ারা, ভাই মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং গিয়াসউদ্দিনের পুত্রবধূ ইপসা জান্নাতুল নাঈম। এ পাঁচজনকেই হেনস্তা করা হয়েছে। এক যাত্রীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় লাগেজ পেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। আবার কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লাগেজ পাওয়া যায়নি। গত পাঁচ বছরে এ ধরনের সহস্রাধিক অভিযোগ রয়েছে লস্ট অ্যান্ড লাউঞ্জ শাখায়। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলেছেন, লাগেজ খোয়া যাওয়া ও লাগেজ কেটে মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে ব্যবস্থা নিলেও লাগেজ কাটা পার্টির তৎপরতা বন্ধ হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ বলছেন ভিন্ন কথা।
গত বছর নভেম্বরে সিনিয়র সাংবাদিক ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হয়রানি করা হয়। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ জন্য দায়ী এক কর্মকর্তাকে শাস্তিও দেওয়া হয়। কিন্তু এ শাস্তি বলির পাঁঠা উল্লেখ করে নূরুল কবীর লেখেন, ‘শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তা বিমানবন্দরে আমাকে আটকাননি। বিমানবন্দরে আমাকে আটকানোর যে তালিকা, সেটা জুনিয়র ওই কর্মকর্তা করেননি বরং তিনি আমার প্রতি ভদ্র ও শালীন আচরণ করেছেন। আমি দেখেছি, তিনি ফোনে তাঁর ঊর্ধ্বতনের কাছ থেকে আমার যাত্রার ছাড়পত্রের জন্য অনবরত চেষ্টা করছিলেন। একইভাবে ফেরার সময়ও তিনি আমাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। নূরুল কবীর আরও উল্লেখ করেন, ওই ভদ্রলোককে (জুনিয়র কর্মকর্তা) শাস্তি দেওয়া মানে সিনিয়রদের দোষ এড়ানোর জন্য জুনিয়র কর্মকর্তাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর সমতুল্য, এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
শুধু সিনিয়র সাংবাদিক নূরুল কবীরের ক্ষেত্রেই নয়, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রবাসীরাই বেশি হয়রানির শিকার বলে অভিযোগ বেশি। যাত্রীদের ধারণা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হবে। রেমিট্যান্সযোদ্ধা প্রবাসীদের হয়রানি কমবে, কিন্তু তা হয়নি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নরওয়ের চারজন নাগরিককে হয়রানি ও বাংলাদেশি নাগরিককে মারধরের ঘটনায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান। তাতে বলা হয়, ৮ জানুয়ারি রাত সোয়া ৯টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক আগমনি কেনোপি-২ এর সামনে দুজন সম্মানিত যাত্রী কর্তৃক বিমানবন্দরের একজন নিরাপত্তা সদস্যকে শারীরিকভাবে আঘাতের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই ভুক্তভোগী কয়েকজন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে নানা অভিযোগ করেন। তবে সামাজিক সম্মান ও পরিচিতির কারণে নিজেদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে রাজি হননি তারা। বিমানবন্দরে যাত্রীদের আকুতি-মিনতি, অভিযোগের কোনো পাত্তা মেলে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রীদের ভাগ্যে জোটে নির্দয় আচরণ। বিমানবন্দর অভ্যন্তরের অন্তত ১২টি ধাপে যাত্রীদের কাছ থেকে চাহিদামাফিক টাকা হাতানোর ধান্দায় নানা রকম হয়রানি চালানো হয়।
বিমানবন্দরে কর্মরত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লাগেজ কাটা পার্টি ও লাগেজ চুরি চক্রের সঙ্গে বিমানবন্দরে কর্মরত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সিভিল অ্যাভিয়েশন ও কাস্টমসের একটি অসাধু সিন্ডিকেট এসব কাজে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে এদের বেশ কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরাও হয়েছে।