‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি; দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।’ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতাটি যেন আজকের বাংলাদেশকেই তুলে ধরেছে। দখল, দূষণ ও নাব্য সংকটে দেশের প্রতিটা নদনদী ও খাল মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তালিকায় থাকলেও মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে অনেক নদী। শুষ্ক মৌসুম আসতেই পানি শুকিয়ে বেরিয়ে এসেছে নদীগুলোর কঙ্কাল। প্রমত্ত পদ্মা-যমুনা-তিস্তার বুকে চাষ হচ্ছে ধান-সবজি। অনায়াসে হেঁটে নদী পার হচ্ছে মানুষ ও গবাদিপশু। নদীর বুকে ক্রিকেট-ফুটবল খেলছে শিশুরা। নদীর এই পরিবর্তন নদীপাড়ের মানুষের জীবনজীবিকা ও পরিবেশকে হুমকিতে ফেলেছে।
প্রতিনিধিদের মাধ্যমে খবর নিয়ে দেখা গেছে, উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, দখল ও নাব্য সংকটে হারিয়ে যেতে বসেছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ভৈরব, কুমার, নবগঙ্গা, চিত্রা, মধুমতী, ঘাঘট, মহানন্দা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী, কালীগঙ্গা, সোমেশ্বরীসহ দেশের অধিকাংশ নদনদী। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দেশের অনেক স্থানে রেকর্ড দেখে নদী চিহ্নিত করে সাইন বোর্ড বসিয়েছে, বর্তমানে যেখানে নেই নদীর কোনো চিহ্ন।
তিন দশক আগেও স্রোতস্বিনী পদ্মার গর্জনে দক্ষ মাঝি-মাল্লারাও সাহস পেতেন না পদ্মার বুকে খেয়া ভাসাতে। জেলেরা নদীতে গেলে উদ্বেগে থাকত পরিবার। সেই পদ্মার অধিকাংশ স্থান এখন শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে আবাদ হচ্ছে ধান ও সবজি। ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করছে অনেক পরিবার। রাজশাহীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মার ৮০ ভাগ এলাকা এখন ধু-ধু বালুচর। বাঘা উপজেলার পদ্মার মধ্যেই চকরাজাপুর ইউনিয়ন। চার মাস আগেও এই ইউনিয়নের আটটি চরের বাসিন্দাদের নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হতো। এখন হেঁটেই নদী পারাপার হচ্ছেন তারা।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি এলাকায় হেঁটে যমুনা নদী পার হচ্ছে মানুষ। নদীতে পানি না থাকায় উপজেলার বেশ কয়েকটি রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ঘোড়া ও গরুর গাড়িতে কৃষিপণ্য পারাপার করছেন কৃষকরা। টানা কয়েক বছর ধরেই বছরের অর্ধেক সময়জুড়ে যমুনায় এমন নাব্য সংকট থাকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ড্রেজিংয়ের অভাবে কুড়িগ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ এখন শুধুই বালুচর। শুকিয়ে যাওয়া চরে চাষ করা হচ্ছে বিভিন্ন সবজি। জেলে পরিবারগুলো পেশা বদলে দিনমজুরসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, শুধু বর্ষাকালেই বোঝা যায় এখানে একটা নদী আছে।
ভরা বর্ষায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোর জেলার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ সালতা নদীর অবস্থাও করুণ। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে খনন করা হলেও নদীটি আবারও সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদীর অধিকাংশ এলাকা এখন রূপ নিয়েছে গোচারণ ভূমিতে। এ ছাড়া সাতক্ষীরা শহরের অদূরে বীনেরপোতা এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া বেতনা নদীর ভিতরে প্রায় ১৫ বিঘা জমির ওপর কারখানা নির্মাণ করতে দেখা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, নেত্রকোনায় জেলায় সোমেশ্বরী, কংস, মগড়া, উব্দাখালী, ধনু, ভোগাই ও গুমাই নদীসহ ১২২টি ছোট-বড় নদী ও খাল ছিল। অধিকাংশ নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে। আর অনেক খাল হারিয়ে গেছে। বরগুনার প্রবেশদ্বার খাকদোন নদটির গুরুত্ব বিবেচনায় বারবার ড্রেজিং করার পরও নাব্য সংকটে নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ভাটার সময় পানি না থাকায় জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেক নৌযানকে।
নদী গবেষকদের হিসাবে দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সহস্রাধিক নদী ছিল। অযত্ন, অবহেলা ও প্রভাবশালীদের দখলে অনেক নদী হারিয়ে গেছে। এর তালিকা নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক হিসাবে দেশের অভ্যন্তরে নদনদী আছে ৪০৫টি। এ ছাড়া ৫৭টি আছে আন্তদেশীয় নদী সংযোগ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রথমে ৭২০টি নদীর হিসাব পায়। পরে ২০২৩ সালের আগস্টে ৯০৭টি নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। পরের মাসে পূর্ণাঙ্গ তালিকায় নদীর সংখ্যা বেড়ে হয় ১০০৮টি। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্স সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, আমরা জরিপ করে দেখেছি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে ১ হাজার ২৭৪টি নদী ছিল। নদীগুলোর নামসহ তালিকাও প্রকাশ করেছিলাম। এদিকে গত ১০ ডিসেম্বর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ১ হাজার ১৫৬টি নদনদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর আগামী পয়লা বৈশাখে নদনদীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত তালিকা চূড়ান্ত করে নদী রক্ষায় পদক্ষেপ না নিলে নদীগুলো শুধু তালিকাতেই থাকবে, বাস্তবে থাকবে না।