খিলগাঁও ফ্লাইওভারের কাছে রেললাইনের পাশে বড়সড় একটা নিচু জায়গা। কিছু জায়গায় জন্মেছে ঘাস ও গুল্ম। বাকিটা ফাঁকা। সেখানে পড়ে আছে গৃহস্থালির অব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র। জায়গাটি মাঠের মতো হলেও মূলত এটা শাহজাহানপুর খাল। অপেক্ষাকৃত চওড়া হওয়ায় খালের এই অংশটা ঝিল নামে পরিচিত। তবে ঝিলে নেই পানি। দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা জমে পানি পরিণত হয়েছে মাটিতে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রবাহ। দখল, অযত্ন, অবহেলায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে খালটি।
শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটির এই খালটিই নয়, রাজধানীর অধিকাংশ খালেরই নাজুক অবস্থা। গত কয়েক মাসে খালগুলোর ধারেকাছে যায়নি কোনো তদারকি সংস্থা। ফলে দূষণই নয়, ভরাট করে দখলও হয়েছে নতুন করে। সরেজমিনে মিরপুরের আনন্দবাজার শাখা খাল, বাউনিয়া খাল, মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল, সাঁতারকুল এলাকার সুতিভোলা খাল, যাত্রাবাড়ীর দেবধোলাই খালের করুণ পরিণতি চোখে পড়েছে। পানিপ্রবাহ নেই বললেই চলে। খালের বিভিন্ন স্থানে জমেছে বর্জ্যরে স্তূপ। অধিকাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য। কিছু স্থানে পানির সরু প্রবাহ দেখা গেলেও তা কালো কুচকুচে। বর্তমান সরকার যখন খাল উদ্ধার করে ব্লু নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, এজন্য বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে; তখন নতুন করে খাল ভরাটও করতে দেখা গেছে অনেক স্থানে। খাল-সংলগ্ন বাসিন্দারা বলছেন, ৫ আগস্টের পর পুরনো দখলদারদের তাড়িয়ে নতুন দখলদাররা জায়গা নিয়েছে। খাল দখল বন্ধ হয়নি।
এদিকে গুগল ম্যাপেও খালগুলো চিহ্নিত করার ব্যবস্থা নেয়নি সরকারের কোনো সংস্থা। যে জায়গাগুলো দিয়ে খাল যাওয়ার কথা, ম্যাপে সেসব স্থানে দেখা গেছে ঘরবাড়ি। কিছু খাল গুগল ম্যাপে দেখা গেলেও তার নাম দেওয়া নেই। ফলে দখল হলেও থাকছে না প্রমাণ। সুনির্দিষ্ট করে খাল চিহ্নিত না করায় খালের নাম নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। এলাকাবাসীর কারও কাছে যে খালটি শাহজাহানপুর খাল, কারও কাছে সেটা খিলগাঁও-বাসাবো খাল।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে খালগুলোর দায়িত্ব হস্তান্তর করে ঢাকা ওয়াসা। এরপর গত চার বছরে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল উদ্ধার, খনন, পরিষ্কার, সৌন্দর্যবর্ধনসহ নানা প্রকল্পের নামে প্রায় সাড়ে সাত শ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সিটি করপোরেশন প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। কিছু কাজও হয়। তবে খালগুলো প্রাণ ফিরে পায়নি। বন্ধ হয়নি খালে আবর্জনা ফেলা। উদ্ধার করা খাল আবার দখল হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, খালের পাড়ে বহু দরিদ্র ও বেকার মানুষের বাস। দৈনিক দুই হাজার টাকা মজুরি দিলে ৫ লাখ টাকায় আড়াই শ মানুষ খাল পরিষ্কার করতে নামিয়ে দেওয়া যায়। এক দিনেই একটি খাল পরিষ্কার করা সম্ভব। একই সঙ্গে খাল দেখভালের জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে মজুরির বিনিময়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে খাল আর ভরাট বা দখল হয় না। সেখানে একটি খাল পরিষ্কার করতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয় কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। মূলত রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটে খালগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরেজমিনে শাহজাহানপুর খালে দেখা যায়, বাগিচা ব্রিজের পর খিলগাঁওয়ের দিকে খালটির ঝিল অংশ প্রায় ২০০ ফুট চওড়া। আর এই খালের পানি নিষ্কাশনের জন্য খিলগাঁও ফ্লাইওভারের কাছে রেললাইনের নিচ দিয়ে রয়েছে ১০-১২ ফুটের বক্সকালভার্ট। আশপাশের বাসিন্দাদের ফেলা বর্জ্য আটকে যাচ্ছে সরু বক্সকালভার্টে। সেসব আবর্জনা জমতে জমতে এখন তা মাটিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, গত বছরের মাঝামাঝি খালটি একবার পরিষ্কার করেছিল সিটি করপোরেশন। কয়েক মাসেই আবার মৃত্যুপথযাত্রী খালটি। অনেক স্থানে খাল ভরাট করে দোকানও হয়েছে।
ইসিবি থেকে কালশি যাওয়ার পথে স্টিল ব্রিজ সংলগ্ন বাউনিয়া খালে গিয়ে দেখা যায়, শুধু দূষণই নয়, বেদখল হয়েছে খালের অনেক অংশ। স্থানীয়রা বলছেন, ১০০-১৫০ ফুটের বেশি প্রশস্ত খালের অনেক স্থান এখন ১০-১৫ ফুটে ঠেকেছে। আগেও খালটি ভরাট হয়েছে। গত জুলাই-আগস্টে দেশে অস্থিরতা শুরু হলে নতুন করে ভরাট শুরু হয়।
মিরপুরের আনন্দবাজার শাখা খালের বিভিন্ন স্থান ভরে গেছে আবর্জনায়। পানির ওপরে মাটির পুরু আস্তর। সেখানে জন্মেছে ঘাস-গুল্ম। স্থানীয়রা বলছেন, আবর্জনা ফেলা মূলত দখলের প্রথম ধাপ। এরপরে খাল দখল করে স্থাপনা উঠবে।
দখল হয়েছে উত্তর সিটির রামচন্দ্রপুর ও সুতিভোলা খালেরও বিভিন্ন অংশ। আন্তজেলা চালক সমিতির নামে রামচন্দ্রপুর খালের জমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে ট্রাক স্ট্যান্ড। খালের বিভিন্ন অংশে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট টিনের ঘর ও আধাপাকা স্থাপনা।