সোনালি সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ডিফারেন্ট টাচ’-এর ভোকালিস্ট মেজবা রহমান; যার গাওয়া ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’, ‘দৃষ্টি প্রদীপ জ্বেলে’সহ বেশ কিছু গান তিন দশকের বেশি সময় পরও কালজয়ী। এখনো সমান দাপটে গান করছেন এ চিরসবুজ গায়ক। বর্তমান ব্যস্ততাসহ নানা বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন- পান্থ আফজাল
নতুন গান নিয়ে এ সময়ে ব্যস্ততা কেমন?
অলরেডি বেশ কিছু নতুন গান করেছি। যেগুলো টিভি মিডিয়া, শোতে গেয়েছি। গানগুলোর ফিডব্যাকও ভালো পেয়েছি। আরও কিছু গান প্রস্তুত রয়েছে। ইচ্ছা রয়েছে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে সেগুলো প্রকাশ করার।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে গান করছেন। এ গানের জগতে যুক্ত হলেন কীভাবে?
আমি গানের মানুষ ছিলাম না, হতে চেয়েছিলাম স্পোর্টসম্যান। স্বপ্ন ছিল দেশসেরা খেলোয়াড় হওয়ার। সেভাবেই খেলাধুলা করতাম, অনেক পুরস্কারও পেয়েছি। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর ঢাকায় এলাম, এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে ক্যাম্পে থাকার সুযোগও হয়। কিন্তু বাবা আর আসতে দিলেন না। সেখানেই খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে তার গিটারের ক্লাসে গেলাম। তখন গিটারের সুর আমাকে আন্দোলিত করে। এরপর স্প্যানিশ গিটারের ওপর লেসন নিলাম। এর মাঝে ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হলাম। এরপর কলেজের অনুষ্ঠানে গিটার বাজিয়ে গান করতাম, দেখলাম বিপুল সাড়া। অনুষ্ঠানে একটা গানের পর সবাই বলে ‘ওয়ান মোর, ওয়ান মোর’। এরপর খুলনার বিভিন্ন কলেজের প্রোগ্রামে আমাকে নিয়ে যেত গান গাওয়ার জন্য। এর মাঝে ইন্টারমিডিয়েট শেষ হলে খুলনাতেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হই। নব্বই দশকের শুরুর দিকে একটা ঘটনাক্রমে আমি ঢাকায় আসি, চিন্তা করলাম আমরা কিছু মৌলিক গান করি। এরপর কিছু গান রেকর্ড করে ছাড়ার পর মানুষ দেখি বিপুলভাবে গ্রহণ করেছে। সেখান থেকেই শুরু হলো আমাদের গানের যাত্রা।
সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হলের ২১৫ নম্বর রুমের স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা জানতে চাই...
৮৬ তে ইন্টারমিডিয়েট শেষ হলে মিউজিক করার জন্য ঢাকায় চলে আসি। তবে মিউজিক করার জন্য যে প্রাকটিসের স্থান দরকার সেটার ভাড়া ইর্ফোট করতে পারছিলাম না। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হলের ২১৫ নম্বর রুম প্রাকটিসের জন্য দেয় আমাদের ব্যান্ড মেম্বার মিলন। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্সের ছাত্র। আমরা খুবই অত্যাচার করতাম। ড্রাম, প্যাড নিয়ে সারা দিন ২১৫ নম্বর রুমে প্রাকটিস চলত। মিউজিকের শব্দে ঘুমাতে পারত না তারা। প্রায় কয়েক মাস মিউজিক প্রাকটিস করেছিলাম। সেখানে প্রাকটিস করে এরপর স্টুডিওতে গান রেকর্ডিং চলত।
ডিফারেন্ট টাচের শুরু কীভাবে হয়েছিল?
ডিফারেন্ট টাচের আগে আমি খুলনার ‘রিপল ট্রাক’ ব্যান্ডে ছিলাম। যার গিটার শুনতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম উনি ওই ব্যান্ড করতেন। সেই গিটারিস্টের দাওয়াতে তাদের চায়ের আড্ডায় গেলাম একদিন। আড্ডার মাঝেই তাদের সঙ্গে গান করলাম। এরপর থেকেই সেই দলে যুক্ত হয়ে অনুষ্ঠান করা। একটা পর্যায়ে গিয়ে মনে হলো সমমনাদের নিয়ে একটা দল করার। সেই ভাবনা থেকে নতুন ব্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়া। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়, তখনো ব্যান্ডের নাম ঠিক হয়নি। খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর কনসার্ট করছি। এক সময় ভাবলাম যদি অ্যালবাম করি তাহলে শ্রোতারা আমাদের গান আরও বেশি করে শুনতে পাবেন। সেই চিন্তা থেকেই ঢাকার একটি স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের কাজ শুরু করি। লক্ষ্য করলাম, আমাদের কিছু গান অন্যরা নিয়ে যাচ্ছে। তাই, দ্রুত অ্যালবাম করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিকে বন্ধু-শ্রোতারা সবাই বলতে লাগলেন, আমাদের গানগুলো একটু ভিন্ন ধরনের, ডিফারেন্ট। তাদের সেই ‘ডিফারেন্ট’ মন্তব্য থেকেই ব্যান্ডের নামকরণ করা হয় ‘ডিফারেন্ট টাচ’। এ নামেই প্রথম অ্যালবাম বাজারে প্রকাশ হলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
কালজয়ী গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ কীভাবে সৃষ্টি হলো?
গায়ক-গীতিকার আশরাফ বাবুর লেখা ও সুর করা গানটি। তবে আমার চেয়ে গানটি সৃষ্টির গল্প তিনি ভালো বলতে পারবেন। যতটুকু শুনেছি, গানটি এক রাতে তৈরি হয়েছিল। তখন প্রথম অ্যালবামের কাজ চলছিল। ১১টি গান রেকর্ড হওয়ার পর ১২ নম্বর গান ছিল এটা। আর সে সময় শ্রাবণ মাসে টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন সময় একদিন শেষ রাতের দিকে জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে আশরাফ বাবু ভাবলেন, শ্রাবণের বৃষ্টি নিয়ে একটা গান লিখলে কেমন হয়! এরপর লিখলেন, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো...’ এভাবেই হলো ১২ লাইনের গানটি।