যে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পবিত্র ধর্মবোধ থেকে দান করা হয় জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে, তাও ব্যাপকভাবে বেদখল, আত্মসাৎ ও লুটপাটের কবলে পড়েছে। ওয়াক্ফ এস্টেটের প্রায় ১০০ বিঘা সম্পত্তি দখল, বেহাত ও সম্পত্তির আয় ক্রমাগত আত্মসাৎ হয়েছে বছরের পর বছর। এ ঘটনা দিনাজপুর নুরজাহান কামিল মাদরাসায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নুরজাহান ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি আমীর খসরু নামে এক ব্যক্তি। গত ১০ বছর তিনি ওয়াক্ফ এস্টেটের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব দিনাজপুর নুরজাহান কামিল মাদরাসায় উপস্থাপন করেননি।
জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম এবং লুটপাটের তথ্যগুলো এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। এ গেল মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা। ২০১৪ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত থাকা সম্পত্তির মধ্যে ৮৫ হাজার ৫৭২ একর ভূমি বেহাত হওয়ার একটি হিসাব এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, দেশে ওয়াক্ফ সম্পত্তির মোট পরিমাণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবে যত সংখ্যক ওয়াক্ফ এস্টেট ও ভূ-সম্পত্তির কথা জানা যায়, তার আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশের কম সরকারি ওয়াক্ফ প্রশাসকের অফিসে নিবন্ধিত আছে। বর্তমানে নিবন্ধিত এস্টেট সারাদেশে প্রায় ২২ হাজার।
এগুলোর অধীনে জমি আছে চার লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে তারা সারা দেশের ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের ঘটনায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছিল। পরে তা নানা কারণে থেমে যায়। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে পুলিশ বক্সসংলঘ্ন বাবুস সালাম মসজিদ-মাদ্রাসার পূর্ব ও উত্তর পাশের ১৭টি দোকান থেকে মাসে ভাড়া আদায় ১০ লাখের বেশি টাকা। মসজিদটির দখল নিয়ে স্থানীয় দুই গ্রুপে দ্বন্দ্ব চলে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এছাড়া উত্তরার আজমপুর জামে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং জুমুর আলী ফকিরের মাজার শরিফেরও ওয়াকফ সম্পত্তির নানা অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে।
সংস্থাটির উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, দুদক আইন-বিধি মোতাবেক সব জালজালিয়াতি এবং আত্মসাতের ঘটনা অনুসন্ধান করে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, ওয়াকফ সম্পত্তির আয় থেকে দিনাজপুরের ওই মাদরাসার কল্যাণে এবং লিল্লাহ বোডিংয়েও কোন ধরনের খরচ করা হয়নি। মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা মৃত কলিমুদ্দিনের ওয়াকফ দলিল করা সম্পত্তিগুলোর কাগজপত্রগুলোর হদিস নেই। এগুলো নিজের জমি বলে দাবি করেছেন। পরিচালনা কমিটির দাতা সদস্য হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে উল্টো মাদরাসার ফান্ড থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে নিজের বাড়ির জমি ভরাট করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব লুটপাটে সহযোগিতা করেছেন মাদরাসাটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম। গত ৫ আগস্টের পর নানা লুটপাট আর অনিয়মের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে মাদরাসা পরিচালনা কমিটি।
সূত্র জানায়, ওয়াক্?ফ প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন এস্টেটের মুতওয়ালিরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে অর্থ আত্মসাৎ করেন। যুগ যুগ ধরে মুসলিম সমাজে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ওয়াক্?ফ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল মুখে সম্পত্তি ওয়াক্?ফ করে যাওয়ার পরও বংশধররা এবং স্থানীয় সমাজভিত্তিক কমিটি মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালিত করে আসছেন এমন নজির অনেক আছে। এ খাতের সম্পত্তি থেকে জনকল্যাণের কাজ সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ আমলে প্রথম ১৯৩৪ সালে বেঙ্গল ওয়াক্?ফ অ্যাক্ট পাস হয়। পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৬২ সালে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সংশোধিত আইন হয়।