মশার লার্ভা নিধনে আমদানি করা জৈব কীটনাশক নিয়ে চরম জালিয়াতি করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেতা আতিকুল ইসলাম। সিঙ্গাপুরের মূল কোম্পানির নাম ব্যবহার করে স্থানীয় ভুয়া কোম্পানি থেকে কীটনাশক আমিদানি করে কোটি কোটি টাকার সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা লোপাট করেন মেয়র আতিকুল ইসলাম ও তার আত্মীয়স্বজনদের মালিকানায় থাকা নামসর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠান। বিদেশি ভুয়া বিশেষজ্ঞ সাজিয়ে মিডিয়ায় মিথ্যাচার করেছেন সাবেক এই মেয়র। জানা গেছে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ডিএনসিসির সাবেক এই মেয়রকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ বাইরে আসতে থাকে। তার শাসনামলে সিটি করপোরেশনের নানান খাত থেকে অর্থ লুটপাট এবং আত্মীয়স্বজনকে প্রভাবশালী পদে বসিয়ে ডিএনসিসিকে একটি পারিবারিক সিন্ডিকেটে পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে। ডিএনসিসির বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত টাকার ভাগ চলে যেত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পকেটেও। ফলে মেয়র আতিকের অনিয়ম দুর্নীতি এমন পর্যায় পৌঁছেছিল যে, তিনি রাখঢাক ছাড়াই অনবরত মিডিয়ার মিথ্যাচার করে বেড়াতেন। জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের এক নাগরিককে অর্থের বিনিময়ে মশানাশক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যালস কোম্পানির বিশেষজ্ঞ সাজিয়ে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেন মেয়র আতিক। যিনি আদতে ওই প্রতিষ্ঠানের কেউ ছিলেন না। সে সময় সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যালস কোম্পানি থেকে ডিএনসিসি কীটনাশক আমদানি করেনি বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদনহীন ওই কীটনাশক নামসর্বস্ব স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে দেশীয় মুদ্রায় কেনা হয়েছিল। যে অফিসের ঠিকানায় গিয়ে ও ফোনে কাউকে পাওয়া যায়নি। গত বছর দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে উত্তর সিটি করপোরেশন নতুন মশার ওষুধ বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস বা বিটিআই প্রয়োগ শুরু করে। গত বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর গুলশান লেকে বিটিআই প্রয়োগের উদ্বোধন করেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। ওই অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যালস কোম্পানি থেকে ৫ টন বিটিআই আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫ কোটি টাকার বিটিআই আমদানির কথা জানায় উত্তর সিটি।
অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যালসের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে উপস্থিত সাংবাদিকদের পরিচয়ও করিয়ে দেওয়া হয়। তার নাম জানানো হয় ‘লি শিয়াং’। বলা হয়, তিনি কোম্পানির এক্সপোর্ট ম্যানেজার এবং তিনি ডিএনসিসির কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি কীটনাশকটি সরবরাহ করেছে। তারা দাবি করেছে, সিঙ্গাপুরের কোম্পানি বেস্ট কেমিক্যালসের উৎপাদক। তবে বেস্ট কেমিক্যালস ইমেইলে জানায় এবং গত বছর ১৩ আগস্ট তাদের ফেসবুক পেজে ঘোষণা দেয়, তারা এটি সরবরাহ করেনি। মরণঘাতী মশার কীটনাশক নিয়ে এটি জঘন্যতম প্রতারণা। বেস্ট কেমিক্যালস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জালিয়াতির সতর্কবার্তা’ (স্ক্যাম অ্যালার্ট) শিরোনামে দেওয়া ওই বার্তায় জানায়, ‘এটা আমাদের নজরে এসেছে যে বাংলাদেশের মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৫ টন বিটিআই লার্ভিসাইড পণ্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) সরবরাহ করেছিল। এতে তারা জালিয়াতির মাধ্যমে (ফ্রডলি) আমাদের কোম্পানির নাম (বেস্ট কেমিক্যাল) বিটিআইয়ের প্রস্তুতকারক হিসেবে ব্যবহার করেছে। মার্শাল অ্যাগ্রোভেট মি. লি শিয়াং নামে যে ব্যক্তিকে বেস্ট কেমিক্যালের রপ্তানি ব্যবস্থাপক (এক্সপোর্ট ম্যানেজার) এবং বিটিআই বিশেষজ্ঞ দাবি করেছিল, তিনি বেস্ট কেমিক্যালের কোনো কর্মী নন।’
এ ঘটনায় মাছ ঢাকতে শাক খুঁজে না পাওয়া সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম গত বছর ১৬ আগস্ট সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণা করে এ বিটিআইকে সবচেয়ে ভালো ও ভেজালহীন বলেছে। আর ৫ টন বিটিআই মাত্র আনা হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে, আমাদের প্রয়োজন হাজার টন।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কীটতত্ত্ববিদ জানান, যে কোনো প্রকার কেমিক্যাল বা কীটনাশক আমদানিতে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধ রয়েছে। আমাদের কাছে এই বিটিআইয়ের সেম্পল পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয় তা কার্যকর কিনা। কিন্তু শুধু কার্যকারিতার ওপর এটি নির্ভর করে না। পরিবেশে ব্যবহারের সময় মানুষ ও পরিবেশের ওপর ক্ষতির মাত্রাসহ ইত্যাদি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।