রংপুর বিভাগে আমন ধান সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে খাদ্য বিভাগ। চাল সংগ্রহ কিছুটা হলেও ধানে আগ্রহ নেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। সরকারি দামের চেয়ে বাজারে ধান-চালের দাম বেশি হওয়ায় কৃষক ও মিলাররা সরকারি গোডাউনে ধান দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ধানের গড় সংগ্রহ সাত শতাংশ। এক জেলায় এখন পর্যন্ত এক কেজি ধানও সংগ্রহ হয়নি।
এদিকে, চলতি আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চাল সংগ্রহের ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি খাদ্য অধিদপ্তর থেকে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রংপুর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমন ধান ও চাল সংগ্রহের অভিযান চলবে। তিন মাসে রংপুর বিভাগে ধানের সংগ্রহ মাত্র সাত শতাংশ। এর মধ্যে কুড়িগ্রামে সংগ্রহের হার শূন্যের কোটায়। সবচেয়ে বেশি নীলফামারীতে ৩৫ শতাংশ, ঠাকুরগাওয়ে ৩ শতাংশ, লালমনিরহাটে ২ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৩ শতাংশ ও রংপুরে এক শতাংশ করে ধান সংগ্রহ হয়েছে।
চলতি আমন মৌসুমে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত ধান সংগ্রহ হয়েছে ৫ হাজার ৬৩৭ মেট্রিক টন। রংপুরে ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ৮৬৪ মেট্রিক টন। সেখানে সংগ্রহ হয়েছে ১৬০ মেট্রিক টন। গাইবান্ধায় ৮ হাজার ৩৪০ টনের বিপরীতে ২৩০, কুড়িগ্রামে ৭ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টনের বিপরীতে সংগ্রহ শূন্য। লালমনিরহাটে ৫ হাজার ৬৪৮ টনের বিপরীতে ১১৪ টন, নীলফামারীতে ৭ হাজার ৫৫ টনের বিপরীতে ২ হাজার ৬৪৩ টন, দিনাজপুরে ১৭ হাজার ৯৯১ টনের স্থলে ২ হাজার ২১ টন, ঠাকুরগাওয়ে ১০ হাজার ১৮১ টনের বিপরীতে ৩১৫ টন এবং পঞ্চগড়ে ৭ হাজার ২৯৩ টনের বিপরীতে ১২০ টন সংগ্রহ হয়েছে।
অপরদিকে আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ১৬৪ মেট্রিক টন। সেখানে এ পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ১৪ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন। শতকরা অর্জন ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৭৫৪ মেট্রিক টন। সেখানে সংগ্রহ হয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৩১২ মেট্রিক টন। শতকরা হিসেবে ৯৫ শতাংশ। এ চাল তিন হাজার ৩১৯ জন মিলারের দেওয়ার কথা রয়েছে।
কৃষক গৌরাঙ্গ রায়, আফজাল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন জানান, সরকারি দরে ধান বিক্রি করলে তাদের লোকসান হবে। এজন্য তারা আগ্রহী নন। খাদ্যগুদামে যে ধান ৩৩ টাকা কেজি, একই ধান ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রি করতে পারছেন কৃষক। বাজারে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪৫০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে। যা সরকারি দরের চেয়ে বেশি। সরকারি দরে ধান বিক্রি করলে তাদের লোকসান হবে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১২ হাজার টাকার ওপর। এক বিঘা জমির ধানের সরকারি মূল্য ১০ হাজার টাকার কিছু ওপরে। সরকারি মূল্যে ধান বিক্রি করলে কৃষকদের বিঘা প্রতি লোকসান হবে এক হাজার টাকা। অপরদিকে, চাল ব্যবসায়ীদের প্রতি কেজিতে আর্থিক ক্ষতি হবে ২ থেকে ৩ টাকা। সরকারি মূল্যে গোডাউনে ধান দিয়ে কৃষকদের লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদনের ব্যয়ও উঠছে না বলে অনেক কৃষক অভিযোগ করেন।
বিঘায় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা কম পাবে কৃষকরা উৎপাদন খরচের চেয়ে। তাই এবার সরকারি গোডাউনে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। অপরদিকে চাল ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকার চালের মূল্য ধরেছেন ৪৭ টাকা কেজি। অথচ চাল উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৪৭ টাকার বেশি।
রংপুর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জহিরুল ইসলাম বলেন, চালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। তবে বাজারের দামের সাথে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
বিডি প্রতিদিন/এমআই