রাষ্ট্রীয় তিন মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। সেখানে জাতীয়তাবাদের ব্যাখায় বলা হয়েছে, জাতিগোষ্ঠীকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ মূলত গণতন্ত্রবিরোধী। সমাজতন্ত্র প্রসঙ্গে বলা হয়, বর্তমান যুগে সমাজতন্ত্র অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখায় বলা হয়, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভক্তি এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে সংবিধানে নতুন করে আরও পাঁচটি মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র।
গতকাল সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ ছয় সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজকে প্রধান করে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার। এর আগে কমিশন তাদের সুপারিশের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে।
মূলনীতি জাতীয়তাবাদ বাদ দেওয়ার ব্যাখায় কমিশন জানিয়েছে- বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ মূলত বাঙালি জাতিগত পরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৯) জাতিকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করে, যা বাঙালি ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তবে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদ অন্য গোষ্ঠীর স্বার্থ বা মূল্যবোধ উপেক্ষা করে। ফলে প্রান্তিকীকরণ ঘটে, যা সামাজিক বিভাজন, বৈষম্য এবং সংঘর্ষের জন্ম দেয়। এতে আরও বলা হয়, ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, যখন একটি রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ে গড়ে ওঠে, তখন যারা এই পরিচয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না, তারা বৈষম্য ও বঞ্চিত হয়। এজন্য রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়ার ব্যাখ্যায় জানানো হয়- সমাজতন্ত্র মূলত গণতান্ত্রিক শাসনবিরোধী। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিগত অধিকার এবং স্বাধীনতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে, যা সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরোধী। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রধানত শিল্প ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, যা ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এই কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ স্বায়ত্তশাসন নীতির বিরোধীও বটে। এ ছাড়া সমাজতন্ত্র সাধারণভাবে সমষ্টিগত মালিকানা এবং সম্পদ বিতরণের ওপর গুরুত্ব দেয়, যা ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। কিউবা এবং প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল, যা রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করেছিল। তা ছাড়া গত কয়েক দশকে সমাজতন্ত্র অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন সুপারিশ করছে, রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া হোক।
ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে বলা হয়- বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি সমাজ, রাষ্ট্রে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এটি বাংলাদেশের বিদ্যমান বহুত্ববাদী সমাজের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং মূলত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিরোধী।
অন্যদিকে সংস্কার কমিশন পাঁচটি মূলনীতি অন্তর্ভুক্তের সুপারিশ করে জানিয়েছে, ১৯৭১ সালে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচারের আদর্শ বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীনতার আদর্শ সাধারণ মানুষকে একতাবদ্ধ করেছিল। অধিকন্তু সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে বহুত্ববাদ অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সংগত সমাজ গঠনে সহায়তা করে। বাংলাদেশের সমাজের বহুত্ববাদী চরিত্রকে ধারণ করে এমন একটি বিধান সংবিধানে যুক্ত করা সমীচীন। কমিশন তাদের সুপারিশে জানিয়েছে-‘বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী, বহু-জাতি, বহুধর্মী, বহুভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।’