বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বলেছেন, সরকারের কয়েকজনের নামে ‘অ্যালার্মিং’ কিছু অভিযোগ কানে আসছে। এগুলো কতটুকু সত্য আমি জানি না। অভিযোগগুলো অত্যন্ত ‘অ্যালার্মিং’। তবে ড. ইউনূস সাহেবের ওপর আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস আছে। তিনি বলেন, হাসিনার আমলে নিজেদের দেশের নাগরিক মনে হতো না। দেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বর্তমানে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা কেমন দেখছেন?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : বিগত ১৫-১৬ বছর দেশে কোনো রাজনীতিই ছিল না। রাজনীতির নামে বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের ওপর যে দমননীতি, অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোনো মিটিং-মিছিল করা যেত না। পুলিশ দিয়ে শাঁসানো হতো। ব্যবসা-বাণিজ্য টাকা-পয়সা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। অনেকে এলাকায় সবকিছু হারিয়ে ঢাকায় এসে রিকশা বা সিএনজি চালিয়ে জীবন চালিয়েছে। আমার নিজের বিরুদ্ধে ৪৫১টি মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন আর আগের মতো আতঙ্কটা নেই। আমরা নিজেদের বাসাবাড়িতে থাকতে পারছি। মানুষের মনে এখন স্বস্তি ফিরে এসেছে। এক সময় নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক মনে হতো না। সেই তুলনায় রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে মানুষ আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। স্বস্তিতে আছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশের অর্থনীতি কেমন চলছে?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : ব্যাংকগুলোকে একেবারে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের লোকেরা নিজের মনে করে ব্যাংকগুলো খালি করে সব টাকা নিয়ে গেছে। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বর্তমানে প্রফেসর ইউনূস সাহেব টেনে তোলার চেষ্টা করছেন। তবে অরাজনৈতিক সরকারের পক্ষে খুব বড় ধরনের কোনো চেঞ্জ আনাটা অত্যন্ত কঠিন। রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে যেটা সম্ভব। তবে তারা খুব বেশিদূর যে এগিয়েছেন- সেটি বলব না। তবে কিছুটা আগানোর চেষ্টা করছেন। আশা করছি, বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও আগের মতোই দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিগত পাঁচ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের পারফরমেন্সটা কেমন। সামনে তাদের কী করা উচিত?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : অন্তর্বর্তী সরকার মোটামুটি ভালো করার চেষ্টা করছেন। হাসিনা সরকারের আমলে যেভাবে ঢালাও লুটপাট হতো- সেভাবে তো হচ্ছে না। তাদের চেষ্টা হয়তো চলছে। কিন্তু সক্ষমতারও একটা ব্যাপার আছে। একটি দেশের অগ্রগতির জন্য দেশের সমগ্র জনগণকেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হয়। এ কাজটি তো অরাজনৈতিক সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সেজন্য অবশ্যই রাজনৈতিক সরকার দরকার। কিন্তু সরকারের ভিতরে সিনিয়র পারসন নন, এমন কয়েকজনের নামে অ্যালার্মিং কিছু অভিযোগ কানে আসছে। অভিযোগগুলো অত্যন্ত অ্যালার্মিং।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে নাগাদ হতে পারে? নির্বাচনের কোনো টাইমফ্রেম আছে কি না?
হাবিব-উন নবী খান সোহেল : অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ন্যূনতম সংস্কার করে যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় নির্বাচন দিয়ে বাকি সংস্কারগুলো নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। কিছু সংস্কার আছে যেগুলো অরাজনৈতিক সরকার সহজেই করে ফেলতে পারে। সেগুলো তারা করুক। তাদের দ্বারা বড় সংস্কার করাটা খুবই কঠিন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাদের দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর অবস্থা কী?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : সরকারের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা এসব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য লিস্ট দিয়েছি। আইনগত প্রক্রিয়াও আমরা যথাযথভাবে ফলো করে যাচ্ছি। আশা করছি, এই সরকার দ্রুত এসব মিথ্যা ও রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করে নেবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : এটা একেবারেই তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তিনি যখন চাইবেন তখনই দেশে ফিরতে পারবেন। তাঁর বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের দায়ের করা মামলগুলো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলো শেষ হওয়ার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মতে, আগামী দিনের নির্বাচন ও রাজনীতি দুটোই বিএনপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। আপনি কী মনে করেন?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : আমাদের জন্য তো নির্বাচনে জয়লাভের জন্য শর্টকাট কোনো রাস্তা নেই। আমাদের তো কেউই ক্ষমতা দিয়ে দেয় না। আবার চুরি করে ভোট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমাদের একমাত্র রাস্তা হলো জনগণ। এজন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদেরকে বারবার জনগণের কাছে যেতে বলছেন। জনগণকে সঙ্গে রাখতে বলছেন। এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : জামায়াত তাদের মতো রাজনীতি করে। যা পিপল-এর সঙ্গে যায় না। তাদের ভোটার এবং কর্মীর সংখ্যাও অনেকটা নির্দিষ্ট। তারা ন্যাচারেলি কর্মী বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে, সমাজে প্রভাব দেখিয়ে সমর্থন নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। তবে এ দেশের জনগণ ধর্মভীরু ঠিক আছে- কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তারা কখনো কোনো ধর্মান্ধগোষ্ঠীর কাছে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেননি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিত কি না?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হোক এটা বিএনপির কাম্য নয়। কিন্তু যারা সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদেরকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে বিচারের মুখোমুখি করাটাই সমীচীন। আওয়ামী লীগের ‘টপ টু বটম’ সবাই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এবং অপরাধী। বিচারের আগে তাদের ইলেকশনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দিলে ইলেকশনটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে। কীভাবে দেখেন?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : নতুন রাজনৈতিক দল গঠনকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে কেউ যদি রাজনৈতিক দল গঠন করতে চায়- কিংস পার্টির মতো পার্টি করতে চায় তাহলে এদেশের জনগণ সেটি কখনোই মেনে নেবে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দল গঠন করলে, আর সে দল নির্বাচনে অংশ নিলে- তখন শেখ হাসিনা আর এরশাদের আমলের নির্বাচনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। তখন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করার দাবি উঠছে। আপনি কী মনে করেন?
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : শেখ হাসিনা দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকুন না কেন- তার বিচার কার্যক্রম চলতেই থাকবে। এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তিনি যে জঘন্য আচরণ করেছেন- খুন, গুম, গণহত্যা চালিয়ে গেছেন এর বিচার হতে হবে। শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিত।
বাংলাদেশ প্রতিদিনকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল : আপনাকেও ধন্যবাদ।