বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বলেছেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধীদের দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের ফেরা সহজ হবে। তিনি বলেন, জনগণের ওপর মিথ্যা মামলা, হত্যা, নির্যাতন করার ফল হিসেবেই জনরোষের শিকার হয়ে আওয়ামী লীগ প্রধানকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে পারাটাই হবে বর্তমান সরকারের জন্য মঙ্গলজনক। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দীর্ঘ ১৩ বছর পর দেশে ফিরলেন। অনুভূতি কেমন?
কায়কোবাদ : একটা মিথ্যা, প্রতারণামূলক মামলায় অন্যায়ভাবে আমাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া, আমাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন।
জনগণের ওপর মিথ্যা মামলা, হত্যা, নির্যাতন করার ফল হিসেবেই জনরোষের শিকার হয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : জুলাই বিপ্লবের ছাত্ররা রাজনৈতিক দল গঠন করছে। কীভাবে দেখছেন?
কায়কোবাদ : রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। ওয়ান ইলেভেনের সরকারও একটা দল গঠনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। এবারও যদি সরকারের সহযোগিতায় দল গঠনের চেষ্টা হয় সেটাও ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত সচেতন। কোটা সংস্কারের জন্য ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। একপর্যায়ে ছাত্রনেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিন মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছিল। এতেই বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রীকে রেখেই যদি ওই তিন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হতো তবে তারা সমঝোতা করে ফেলত। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং দেশের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই আন্দোলনের সাফল্য এসেছিল। কেউ এককভাবে এই আন্দোলনের সাফল্য দাবি করতে পারে না। তবে প্রথম দিকে ছাত্ররা যে ভূমিকা রেখেছিল তার জন্য তাদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু এর আগে আর কখনোই ছাত্রদেরকে মন্ত্রণালয় চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকারের পাঁচ মাসের মূল্যায়ন ও নির্বাচনি রোডম্যাপ প্রসঙ্গে কী বলবেন?
কায়কোবাদ : ব্যাংকিং সেক্টরে কিছুটা সাফল্য এসেছে। আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তেমন সফল হতে পারেনি। প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই সরকারের মধ্যেও আওয়ামী লীগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তারা নিজেদের পছন্দমতো ডিসি, এসপি, ইউএনও নিয়োগ দিচ্ছে। এই যদি হয় পরিবর্তনের নমুনা তাহলে লাভটা হলো কী! দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে পারাটাই হবে এই সরকারের জন্য মঙ্গলজনক।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে কেন?
কায়কোবাদ : সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার কার্যক্রমের জন্য সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কায়কোবাদ : জামায়াত সুসংগঠিত দল। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট করে কত আসন পেয়েছে। আবার বিএনপির সঙ্গে জোট না করে যতগুলো নির্বাচন করেছে সেগুলোতে তারা কয়টি আসন পেয়েছে। জামায়াত যতবার ভুল করেছে ততবারই বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। আশা করেছিলাম, বিএনপি, জামায়াত এবং অন্য ইসলামি দলগুলো একত্রে থেকে দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে হতাশ হয়েছি। ফ্যাসিবাদ বিরোধীদের দ্বন্দ্বে সবচেয়ে লাভবান হবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্টরা। এতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা সহজ হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার দাবি উঠছে। আপনি কি মনে করেন?
কায়কোবাদ : এই আন্দোলন ছিল জনগণের আন্দোলন। জনগণ আওয়ামী লীগের ওপর এখনো ক্ষিপ্ত। বিচার না পেলে তারা আশাহত হবে। তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আওয়ামী লীগ যেসব অপরাধ করেছে তার যেন পুনরাবৃত্তি আর না হয় সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
কায়কোবাদ : আওয়ামী লীগ যেমন সম্পর্ক রেখেছিল তেমন সম্পর্ক রাখার পক্ষে আমি নই। দেশের স্বার্থে যতটুকু সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন ততটুকুই রাখা উচিৎ। ব্যবসায়ীদের উপেক্ষা করার ফল ভালো হয় না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকারের কাছে আপনাদের মূল প্রত্যাশাটা কী?
কায়কোবাদ : সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। যে নির্বাচনের মাধ্যমে একটা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাকে আইনগতভাবে অনুমোদন দিতে পারে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কী মনে করেন?
কায়কোবাদ : ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে ইসলামি দলগুলোকে একত্রিত করা সম্ভব হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী যদি রাজি থাকে তবে একমাত্র বিএনপির পক্ষেই সম্ভব তাদেরকে একত্রিত করা। জামায়াতের পক্ষে সব কটি ইসলামি দলকে একত্রিত করা সম্ভব হবে না। ইসলামি দল ও সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে সুসর্ম্পক রক্ষা করে চলেছি। দল চাইলে দলীয়ভাবেও এই সম্পর্ক কাজে লাগাব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
কায়কোবাদ : আপনাদেরও ধন্যবাদ।