টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য চলতি বছরকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের বছর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগসহ সাতটি বাধাকে সবচেয়ে বড় হিসাবে চিহ্নিত করেছেন তারা। এর মধ্যে রয়েছে- বিচ্ছিন্ন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, জটিল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, অবকাঠামো শেয়ারিং (ফাইবার, নেটওয়ার্ক ও টাওয়ার), স্পেকট্রাম, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমএনও)-এর জন্য উচ্চ ট্যাক্স, সহযোগী ব্যবসা ও অসম প্রতিযোগিতা। এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) স্বয়ং। তারপরও বাস্তবতা হলো টেলিকম খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতার কোনো পরিবেশ নেই। একটি অপারেটরই প্রতি বছর বিপুল মুনাফা অর্জন করছে কেন- সেই প্রশ্নেরও কোনো মীমাংসা নেই। এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশনের সাবেক পরিচালক মো. খালেদ আবু নাসের বলেন, ১৫ অক্টোবর থেকে প্রতিযোগিতা কমিশন অকার্যকর। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এ খাতে বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ বাড়তেই থাকবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্ন লাইসেন্সিং কাঠামো নতুন বিনিয়োগকারীদের বাজারে প্রবেশ জটিল করে তুলছে। কারণ রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় সুশাসন উপেক্ষিত হয়। এ খাতের জন্য তৈরি বিধিবিধানগুলোও প্রভাবশালী পক্ষেই থাকে। অবকাঠামো শেয়ার করার সুযোগও সীমিত। অ্যাকটিভ শেয়ারিং গাইডলাইন এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ স্পেকট্রাম মূল্য বাংলাদেশে। এমএনও খাতে বিশ্বের সর্বোচ্চ ট্যাক্স ৫৪ দশমিক ৪ ভাগের সঙ্গে যোগ হয় সিম ট্যাক্স ৩০০ টাকা। এমএনও-গুলো শেষ সীমা পর্যন্ত ফাইবার স্থাপনেরও সুযোগ পায় না। টেলিযোগাযোগ খাতের সহযোগী ব্যবসা খাতেও ওটিটিতে লিনিয়ার টিভি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমএনওর জন্য ডিএফএস অনুমোদিত নয়। এমএনও নেটওয়ার্ক মনিটাইজ করার ক্ষেত্রে বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। এ ছাড়া অসম প্রতিযোগিতার ফলে একটি অপারেটরের ৯০ ভাগ এরও বেশি প্রফিট মার্কেট শেয়ারে রয়েছে। সম্প্রতি টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে টেলিযোগাযোগ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও নতুন বিনিয়োগ নিশ্চিতে সিগনিফিক্যান্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি) গাইডলাইন কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসএমপি গাইডলাইন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ছোট অপারেটরদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এই খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। বৈঠকে উল্লেখ করা হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০১৮ সালে এসএমপি গাইডলাইন চালু করলেও এর গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এসএমপি নীতিমালার ধারা ৭(১১)-তে বার্ষিক পর্যালোচনার নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষিত হয়েছে।
রবির হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদুল আলম বলেন, ন্যায্য বাজার প্রতিযোগিতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো টেলিকম খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতার কোনো পরিবেশ নেই। একটি অপারেটর প্রতি বছর বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। এর কারণ হলো টেলিকম বিধিমালা বৃহৎ অপারেটরদের সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে ছোট অপারেটরদের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করছে।
বাংলালিংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স তাইমুর রহমান বলেন, যেসব নিয়মনীতি আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। অপারেটরদের মধ্যে অবকাঠামো ভাগাভাগি (ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং) করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বাধ্যবাধকতা রাখতে হবে। সামনে যেহেতু এআই এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আসছে- আমাদেরকে বাজারে প্রতিযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যাবে, সে বিষয়ে মনোনিবেশ করতে হবে।
টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী বলেন, অসম প্রতিযোগিতার এতটাই খারাপ অবস্থা যে, এইটা নিয়ে বলার পরিস্থিতিই নেই। অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। এই প্রতিযোগিতার মাঝে টেলিটক কষ্ট করে টিকে আছে। এমটবের সেক্রেটারি জেনারেল লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) মো. জুলফিকার বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে আরও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে পুরো খাতকে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির মধ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশনের সাবেক পরিচালক মো. খালেদ আবু নাসের বলেন, ১৫ অক্টোবর থেকে প্রতিযোগিতা কমিশন অকার্যকর। বিটিআরসির সঙ্গে কমিশনের তেমন কোনো লিয়াজোঁ নেই। ফলে একচেটিয়া বাজার তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পুরো টেলিকম খাতের পরিবর্তন প্রয়োজন। ফরেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী পরিচালক ও সিইও টিআইএম নুরুল কবির বলেন, কাউকে রাজনৈতিক সুবিধা না দিয়ে বরং ভাবতে হবে আমাদের একীভূত লাইসেন্স মডেল প্রয়োজন কি না। তিনি এই খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিটিআরসির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, খাত সংশ্লিষ্টদের মাঝে সহযোগিতা বা অংশীদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। টেলিকম খাতের উচিত হবে গ্রাহকদের ক্ষমতায়নে আরও মনোনিবেশ করা। সেবার মান বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ব্যবসাকে সমর্থন করা হবে।