২০২৫ সালের স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত বিশিষ্টজনদের মধ্যে রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও পপ গানের গুরু আজম খান। এ প্রয়াত বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর কাজের অবদানের জন্য পাচ্ছেন সর্বোচ্চ এ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
একাত্তরের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা আজম খান কীভাবে গানের জগতে এলেন? জীবদ্দশায় তিনি বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের গানের প্রতি বিশেষ করে গণসংগীতের প্রতি একটা বাড়তি টান তার মনে ছিল। কিন্তু পুরোদস্তুর সংগীতশিল্পী হবেন এমনটা ভাবেননি কখনো। বরং পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশ ও প্রজন্মের স্বার্থেই তিনি গলায় তুলে নিয়েছেন গান।’
আজম খানকে বলা হয় বাংলা পপ গানের গুরু। মাত্র একুশ বছর বয়সে একুশের টগবগে তরুণ হয়ে তিনি গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। সেকশন কমান্ডার হয়ে লড়াই করেছিলেন পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা কেন গানে এসেছিলেন? এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ করে আসলাম। চোখের সামনে দেখলাম তরুণ প্রজন্ম কেমন যেন হতাশায় ভুগছে। নানা অন্যায়-অপরাধ কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হলো একটা কিছু করা দরকার। মাথায় এলো, আমার তো সংগীতের জোর আছে। যুদ্ধের ক্যাম্পেও গান করেছি। তো এই সংগীত দিয়েই তরুণদের আমি আটকাতে চেয়েছি। ওরা যাতে উন্নত বিশ্বের উন্নত মানসিকতায় বেঁচে থাকে। এভাবেই আমার গানে জড়িয়ে পড়া। দিন-রাত নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়ে থাকতাম গানে।’ ১৯৫০ সালের এই দিনে তিনি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যদিও তাঁর বেড়ে ওঠা কমলাপুরে। তাঁর আসল নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। দলটির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে গানও করেছেন তিনি। তাঁর বড় ভাই সংগীতের আরেক কিংবদন্তি আলম খান।
১৯৬৮ সালে তাঁর বয়স যখন ১৮, যোগ দেন গণসংগীত শিল্পীগোষ্ঠী ‘ক্রান্তি’র সঙ্গে। ১৯৬৯-এ গণ অভ্যুত্থানে ছিলেন সামনের সারিতে। সংগত কারণেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চক্ষুশূল ছিলেন তাঁরা। এ সময়ে নানারকম বাধা ও হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সময়ে তাদের অত্যাচার-নির্যাতন আজম খানকে করে বিক্ষুব্ধ। সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে যাবেন। মাকে কথাটা বলতেই মা বললেন বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য। ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে অনুমতি চাইলেন আজম। কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন সরকারি কর্মকর্তা আজম খানের বাবা। তিনি ভেবেছিলেন বাবা হয়তো ‘না’ বলবেন। কিন্তু আজম খানকে অবাক করে দিয়ে তাঁর বাবা বললেন, ‘যুদ্ধে যাচ্ছিস যা, দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না।’ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আজম। কয়েকজন বন্ধু মিলে আজম খান বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে। প্রথমে কুমিল্লা, তারপর সেখান থেকে হেঁটে আগরতলা। আগরতলা থেকে মেঘালয়ে গিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। সেখানে দুই মাস প্রশিক্ষণ শেষে সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কুমিল্লার সালদায়। সফলভাবে সেই অপারেশন সম্পন্ন করার পর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ তাঁকে ঢাকায় গেরিলা অপারেশন পরিচালনার জন্য সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। গুলশান ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তাঁরা বেশ কয়েকটি দুঃসাহসী অপারেশন পরিচালনা করে পাকিস্তান বাহিনীর ঘুম হারাম করে দেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘অপারেশন তিতাস’। এর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা শহরের গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে দেওয়া। ক্যাম্পে থাকার সময় আজম খান বাটি আর চামচকে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে গান করতেন। আর এর মধ্য দিয়ে চাঙা রাখতেন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল। স্বাধীনতার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে নিজের একটি ব্যান্ড গঠন করেন আজম খান ‘উচ্চারণ’ নামে। এখান থেকে তিনি পশ্চিমা ঢঙে গান বানানো শুরু করেন। তবে তাঁর গানগুলো ছিল সহজ-কথা সুরে। প্রথম বছরই বিটিভিতে গান করার সুযোগ পান আর ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি গেয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময় আরও বহু গানে শ্রোতাদের মনে ঝড় তুলেছিলেন আজম খান। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- ‘আমি যারে চাই রে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘অ্যাকসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাই কোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি।
আজম খানকে ‘গুরু’ হিসেবে প্রথম ডাকা শুরু করেছিলেন তাঁর সতীর্থ গিটারিস্ট রকেট। পরে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সবাই তো বটে, শ্রোতারাও তাঁকে ‘গুরু’ বলে ডাকা শুরু করেন। যদিও এ ডাকে বরাবরই সবিনয় অস্বস্তি ছিল আজম খানের। শুধু গান নয়, তিনি অভিনয় এবং মডেলিংও করেছেন। ১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে হিরামনের একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া কিছু বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবেও তাঁকে দেখা গেছে। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য এর আগে ২০১৯ সালে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক দেওয়া হয়। এর ৭ বছর আগেই, ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।