একেকজন তাঁকে একেক অভিধায় অভিহিত করেছেন। কেউ বলেছেন, ‘অকুতোভয় রাজনীতিবিদ’, কেউ বলেছেন ‘বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান’। আমি আমার লেখা ‘জরুরি অবস্থা বিএনপি ও কিছু না বলা কথা’ বইটি তাঁর নামে উৎসর্গপত্রে তাঁকে আখ্যায়িত করেছিলাম ‘বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি’। বর্ষীয়ান সাংবাদিক-সম্পাদক শফিক রেহমান বলেছিলেন ‘সাহসী প্রবীণ যুবক’। সব অভিধাই তাঁর জন্য প্রযোজ্য। তবে শফিক রেহমানের আখ্যাটি অভিনব সন্দেহ নেই। কেননা একজন প্রবীণ আবার কীভাবে যুবক হন? অনেকের কাছেই তা অবাস্তব মনে হতে পারে। আমরা সাধারণত বয়স এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা দেখেই কে যুবক, কে প্রবীণ কিংবা বৃদ্ধ তা নির্ধারণ করে থাকি। তবে কাজের মধ্য দিয়েও যে মানুষের নবীনত্ব ও প্রৌঢ়ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে, তা কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। অনেকে যুব বয়সেই চিন্তা ও কাজে প্রৌঢ় বা বৃদ্ধের মতো আচরণ করেন। আবার অনেকে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও নবযুবার মতো সাহস নিয়ে এগিয়ে যান। প্রচলিত কথা হলো, ‘সাহসী মানুষ কখনো বুড়িয়ে যায় না।’ হয়তো শারীরিকভাবে দুর্বল হতে পারেন, তবে মানসিকভাবে তিনি থাকেন সতেজ-সবুজ।
যাঁকে কেন্দ্র করে আমার এই গৌড়চন্দ্রিকা, তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন; যিনি দলের অত্যন্ত ঘোরতর বিপদের সময় দায়িত্ব পেয়ে তা সঠিকভাবে পালনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের জীবন ও নিরাপত্তাকে তুচ্ছজ্ঞান করে অবিচল থেকেছেন নীতি ও আদর্শের প্রতি। চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন দল ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের।
এক কঠিন দুর্দিনে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। যদিও অনেক আগে থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। ১৯৭৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পর ঢাকায় চলে আসি। সে সময় একদিন বড় ভাই ভাসানী ন্যাপের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াসউদ্দিন খান বাদলের সঙ্গে আরমানিটোলা এলাকা দিয়ে আসার সময় একটি বাড়ির সামনে ঝোলানো নেমপ্লেটের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘ইনি একজন বড়মাপের রাজনীতিবিদ। আগে আমরা একই দল করতাম। তিনি এখন মোজাফফর ন্যাপের নেতা।’ দেখলাম বোর্ডে লেখা ‘এডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন’। সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হবে, তখন তা ঘুণাক্ষরেও মনে আসেনি। মোজাফফর ন্যাপ থেকে জাগদল, তারপর বিএনপিতে থিতু হয়েছিলেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় তিনি অনেকের চেয়ে বড় হলেও সব সময় লো-প্রোফাইলে থেকেছেন। এই থাকাটা কিছুটা তাঁর অন্তর্মুখী চরিত্রের কারণে, কিছুটা রাজনীতির নানা কূটচালের শিকার হয়ে। ১৯৭৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তাঁকে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় সংসদের চিফ হুইপ পদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম একজন প্রবীণ বিএনপি নেতার কাছে। তিনি বলেছেন, ‘খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন নিঃসন্দেহে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। মন্ত্রিত্ব তাঁর প্রাপ্য। তবে জাতীয় সংসদে তাঁর মতো অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান অত্যন্ত প্রয়োজন বিধায় তাঁকে সেখানেই দেওয়া হয়ে থাকবে।’ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না দেওয়ার এটা কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ কি না, সে বিতর্কে যাব না। দেখা গেছে, তাঁর চেয়ে কয়েক ধাপ নিচের নেতারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, কিন্তু তিনি পাননি। অবশ্য এ নিয়ে তাঁর কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ ছিল না। একান্ত আলাপে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলেছিলেন, ‘কেবল তো রাজনীতির মেঠোপথে হাঁটছো, রাজপথে আসো, তারপর দেখবা কত জায়গায় কত গর্ত, খানাখন্দ আর কাঁটা ছড়ানো। ওইসব অতিক্রম করে এগোতে হয়। মন্ত্রী হইতে পারি নাই দুঃখ নাই। দল আমাকে যে কাজের জন্য উপযুক্ত মনে করেছে, সেখানেই রেখেছে। আমার কী-ই বা বলার থাকতে পারে।’ না, মুখ ফুটে তিনি বলেননি কোনো দিন। দলের দেওয়া দায়িত্ব নিবিষ্টচিত্তে পালন করে গেছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। তাই দেখা গেল যখন তিনি দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পেলেন, জীবনবাজি রেখে সে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী (সাবেক) বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালনকালে প্রায়ই জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যেতে হতো। সেখানেই খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ও পরিচয়। পরে ওয়ান-ইলেভেনের সময় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ম্যাডাম যখন তাঁকে মহাসচিব নিযুক্ত করলেন, তাঁর ন্যাম ভবনের বাসায় গিয়ে বললাম, ‘ভাই, আমি ম্যাডামের সহকারী প্রেস সচিব ছিলাম। এখনো সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছি। ম্যাডামের নির্দেশ আছে তিনি যাঁকে দায়িত্ব দেবেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করার।’ আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘হ, তোমারে তো দেখছি পার্লামেন্টের অফিসে। ঠিক আছে শুরু করো। মনে রাইখ, চরম বিপদের সময় দায়িত্ব পালন করছ। ঝুঁকি আছে কিন্তু।’ বলেছিলাম, ‘আপনি এই বয়সে যদি ঝুঁকি নিতে পারেন, আমি কেন পিছিয়ে যাব?’ সেই থেকে শুরু। তারপর থেকে তাঁর ন্যাম ভবনের বাসায় প্রায় প্রতিদিন যেতাম কাজের জন্য। দলের জন্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখা, প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা ইত্যাদি কাজ করতাম তাঁর নির্দেশনা মতো। কখনো কোনো ভুল হলে মৃদু তিরস্কারের সুরে বলতেন, ‘তোমার মতো অভিজ্ঞ মানুষ কেন ভুল করবে? হেসে মাথা নেড়ে বলতাম, ‘ভাই ভুল তো মানুষেরই হয়। আর ভুল না হলে শুদ্ধটা শিখব কী করে?’ মৃদু হেসে সায় দিতেন।
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় থেকে তাঁর তিরোধান পর্যন্ত। এর আগে তিনি তাঁর এলাকার জনপ্রিয় নেতা ছিলেন, জাতীয় সংসদে ভূমিকা রেখেছেন একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। অবশ্য বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দলীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর গোটা দেশে তিনি পরিচিত হন জাতীয় নেতা হিসেবে। তদুপরি নীতির প্রশ্নে তাঁর আপসহীনতা ও দলের প্রতি বিশ্বস্ততা তাঁকে মানুষের কাছে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে।
তৎকালীন সেনাসমর্থিত কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রচ- চাপের মুখেও তিনি মাথা নত করেননি। অনেকেরই মনে থাকার কথা, ওই বছর ২৯ অক্টোবর রাতে বিএনপিকে ছিনতাইয়ের একটি অপচেষ্টা হয়েছিল। ওইদিন মধ্যরাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসায় ‘স্থায়ী কমিটির সভা’ নামে একটি একাঙ্কিকা মঞ্চস্থ হয়েছিল। এর নাটের গুরু ছিলেন বহিষ্কৃত সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। আর নাটকের পরিচালক ছিল সরকারের একটি ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থা, তথা খোদ সরকার। ওইদিন সকালে যথারীতি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বাসায় গিয়ে শুনলাম তিনি বাসায় নেই। পরে জানলাম তিনি বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সিনিয়র এক সাংবাদিক আমাকে জানালেন, বিএনপিকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা হচ্ছে। বিকালে ফোন করলাম রুহুল কবির রিজভীকে। মহাসচিবের কথা জিজ্ঞেস করায় তিনি জানালেন, ‘উনি নিরাপদ স্থানে আছেন, আমিও সরে গেছি। আপনিও সরে যান। মহাসচিবকে না পেলে ওরা আমাকে বা আপনাকে খুঁজতে পারে।’ মন খারাপ করে দৈনিক দিনকাল অফিসে বসে থাকলাম। কী করা যায় ভাবছি। অবশেষে পরিচিত একজনের বাসায় রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও তাদের টেলিভিশন সেটটি সামনে নিয়ে বসে থাকলাম। রাত ১২টার দিকে চ্যানেল আইয়ের পর্দায় লেখা ভেসে উঠল সাইফুর রহমানের বাসায় স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হচ্ছে। সাড়ে ১২টার দিকে সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের ব্রিফ করলেন। খবরে বলা হলো, ‘বিএনপির স্থায়ী কমিটির বিশেষ সভায় সাইফুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। অসুস্থতার জন্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে অব্যাহতি দিয়ে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অস্থায়ী মহাসচিব নিযুক্ত করা হয়েছে। খবরে বলা হলো, ওই সভায় এম সাইফুর রহমান, এম শামসুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, চৌধুরী তানভীর আহমদ সিদ্দিকী এবং বহিষ্কৃত নেতা আবদুল মান্নান ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। (সূত্র : জরুরি অবস্থা বিএনপি ও কিছু না বলা কথা)। আমি রুহুল কবির রিজভীকে ফোন করে আমাদের করণীয় জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘মহাসচিবের উদ্ধৃতি দিয়ে যে কটা সম্ভব পত্রিকা ও টিভিতে জানিয়ে দিন, এটা বিএনপির গঠনতন্ত্রবিরোধী তৎপরতা। বিএনপির নেতা-কর্মীরা এ অবৈধ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছে।’ আমি প্রথমেই ফোন করলাম চ্যানেল আইয়ের সালেহ শিবলীকে। তিনি বললেন, ‘আমি এটা রিজভীর স্বকণ্ঠে প্রচার করতে চাই।’ আমি রিজভীর সঙ্গে কথা বলে তার ব্যবস্থা করলাম। এর আধা ঘণ্টা পরেই চ্যানেল আইয়ে রিজভীর স্বকণ্ঠ বিবৃতি প্রচারিত হলো।
পরদিন সকালে গেলাম বারডেম হাসপাতালে। সাংবাদিকদের চলে আসতে বললাম। বেলা ১টার মধ্যে সবাই বারডেম হাসপাতালের ১৫০৩ নম্বর কেবিনে উপস্থিত হলো। নাকে-মুখে নল লাগানো অসুস্থ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সেদিন সাহসিকতার সঙ্গে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তাতে ষড়যন্ত্রকারীদের সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, কীভাবে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা সাইফুর রহমানের বাসার ওই মিটিংয়ে না গেলে তাঁকে হত্যা ও তাঁর পরিবারকে ডেস্ট্রয় (ধ্বংস) করার হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু তিনি কৌশলে বাসা থেকে বেরিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন খিলগাঁওয়ে সাবেক ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর আলম মিন্টুর শ্বশুরের বাসায়। পরবর্তী সময়ে অনেকেই বলেছেন, ওই রাতে মহাসচিব যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা না করতেন, তাহলে বিএনপির ইতিহাস আজ অন্যভাবে লিখতে হতো। বিএনপিকে ছিনতাই করে তা থেকে জিয়া পরিবারকে উৎখাতের জঘন্য এক পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেদিন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের দৃঢ়তা ও কুশলতার কারণে ওদের সে চক্রান্ত বিফলে গেছে। সেই দুঃসময়ে বিএনপিকে রক্ষা করতে দেলোয়ার ভাই যে ভূমিকা পালন করেছেন, পরবর্তী সময়ে অনেকেই তাকে দুঃসাহসী কাজ বলে অভিহিত করেছেন, প্রশংসা করেছেন। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন শ্রমিক দলনেতা আনোয়ার হোসেন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ম্যাডাম মুক্তি পান। কয়েক দিন পর গুলশানের কার্যালয়ে শ্রমিক দলের একটি সভা হয়েছিল। তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, আপনি জেলে যাওয়ার পর ঢাকায় একটি ব্যাংকের লকার ভেঙে ডাকাতি হয়েছে। কিন্তু আপনি বিএনপিকে এমন এক লকারে রেখে গিয়েছিলেন, যে লকার ভাঙা তো দূরের কথা, কেউ সেটাকে স্পর্শও করতে পারেনি। সে লকার মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।’
এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? ওয়ান-ইলেভেনের দুর্যোগের সময়ে বিএনপির জন্য খোন্দকার দেলোয়ার দুর্ভেদ্য লকার হিসেবেই কাজ করেছেন। এ বছর তাঁর ১৪তম মৃত্যুবাষিকীতে তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়। কামনা করি তাঁর বিদেহী রুহের মাগফিরাত।
♦ লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক