হিমালয়ান সমতল ভূমি বেষ্টিত জেলা পঞ্চগড়ের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫০টি ছোট বড় নদ নদী। সম্প্রতি সরকারিভাবে এই নদীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে ৩৩টি নদীর কথা জানা গেলেও প্রায় ১৭টি নদী তালিকা বহির্ভুত ছিলো। প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা কারিগর এবং রিভারাইন পিপল নামের দুটি সংস্থার উদ্যোগে ২০২৪ সালের শেষের দিকে পঞ্চগড় জেলার নদ নদীর অনুসন্ধানে আরও ১৭টি নদ নদীর খোঁজ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকি বলেন, আগে পঞ্চগড়ে ৩৩টি নদীর কথা বলা হতো। এরপরে আমি, রিভারাইন পিপল এবং কারিগর নামের প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক একটি সংস্থার উদ্যোগে আমরা নতুন করে পঞ্চগড়ের নদ-নদীর গবেষণামূলক অনুসন্ধান করি। আমরা আরও ১৭টি নদীর সন্ধান পাই। এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই ১৭টি নদী সংযুক্ত করেছে। পঞ্চগড়ের নদ নদীর সংখ্যা এখন ৫০। তবে সকল নদ নদীই এখন দখল দূষণে আক্রান্ত।
পাহাড়ি সমতল অঞ্চল হওয়ায় কিছু নদী বয়ে এসেছে ভারতের পর্বতাঞ্চল থেকে। আর ৩৪টি নদীর উৎপত্তি ঘটেছে এই জেলার খাল বিল থেকে। এই নদীগুলো সুদীর্ঘকাল ধরে এই জেলার সংস্কৃতি ও কৃষি নির্ভর অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে আসছে। নদীগুলোর অপার প্রতিদানে এই জেলার মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানে সবধরনের ফল ফসলের আবাদ হচ্ছে। কিন্তু নদীগুলো বিলীন হয়ে হয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী। স্থানীয়রা বলছেন, একযুগ আগেও এসব নদীতে সারাবছর পানি থাকতো। পাওয়া যেতো নানা ধরনের দেশী মাছ। বর্তমানে অধিকাংশ নদী জলশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব নদীতে চাষ করা হচ্ছে বোরো আবাদ। নদীগুলোতে বোরো আবাদ করার ফলে ব্যবহার করা হচ্ছে অতিরিক্ত সার এবং কীটনাশক। সার কীটনাশকের প্রভাবে মাছের প্রজনন হচ্ছে না। হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতীর মাছ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েক প্রজাতীর মাছ হারিয়ে গেছে। অপরিকল্পিতভাবে চাষাবাদের ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। ফলে গতিপথ বদলে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি নদী থেকে অপরিকল্পিত এবং অবৈধভাবে পাথর বালি আরোহন করা হচ্ছে। পাথর উত্তোলনের ফলে ডাহুক নদ নিশ্চিহ্ণ হয়ে পড়েছে, তালমা নদীর পাশেই গড়ে উঠেছে কয়েকটি বাজার। এই বাজারের সকল ময়লা ফেলা হচ্ছে নদীতে। হাড়িভাসা ও চাকলা বাজারের ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে কুরুম নদীতে। বোদা উপজেলা শহর গড়ে উঠেছে পাথরাজ এবং ঝিনাইকুড়ি নদীর তিরে। উপজেলা শহরের সকল হোটেলসহ সব ধরনের দোকান পাটের ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। পাথাজ খন করা হলেও ঝিনাইকুড়ি মরে যাওয়ার পথে। ভুল্লি নদীতে বর্ষাকালে পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে বোরোর আবাদে ভরে যায়। নদী পাওয়া যায়না। স্থানীয় কৃষকরা এই নদীতে বোরো আবাদ করছেন। বুড়ি তিষ্ণা নদীতেও শুকনো মৌসুমে পানি প্রবাহ থাকেনা। দেবীগঞ্জ এবং পঞ্চগড় শহর গড়ে উঠেছে করোতোয়া নদীর তীরে। এই দুই বৃহৎ শহরের সমস্ত ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে করোতোয়ায়। হাসপাতাল, ক্লিনিকের ময়লা আবর্জনাও ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। গোবরা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে সীমান্ত উপজেলা শহর তেতুলিয়া ।
এই শহরের সকল ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় এই নদীতে। নদীটি প্রায় মৃত। এই উপজেলার তীরনই হাট বাজার গড়ে উঠেছে তীরনই নদীর তিরে। ভারতের শিলিগুড়ি শহরের সকল বর্জ্য ফেলা হয় মহানন্দা নদীতে। তাই মহানন্দার পানিও দূষিত। অন্যান্য নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাটবাজারের ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতেই। ফলে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দূষিত হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক কোন উদ্যোগ নেই। নেই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কোন উদ্যোগ। ফলে নদী গুলো ধিরে ধিরে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণী। পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চাষাবাদেও দেখা দিয়েছে মলিনতা। কারণ নদী শুকিয়ে যাবার ফলে সেচ দিয়ে পানি দিতে হচ্ছে। ফলে চাষাবাদে খরচের মাত্রা বেড়ে গেছে।
এদিকে নদী দখল করে অনেকে গড়ে তুলছে ভবন, দোকান পাট, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সদর উপজেলার হাড়ি ভাষা এলাকায় কুরুম নদী দখল করে গড়ে উঠছে দোকান, প্রতিনিয়ত হচ্ছে চাষাবাদ। ডাহুক নদ দখল করে কয়েকটি কোম্পানী গড়ে তুলেছে কারখানা, রিসোর্ট, পোল্ট্রি ফার্ম। জেলা শহরের উপকন্ঠে তালমা নদী দখল করে গড়ে উঠেছে পার্ক, ভবন এবং ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান। তেতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকায় করোতোয়া নদী দখল করে গড়ে উঠেছে চা বাগান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বসত বাড়ি। দখলের ফলে এসব নদীর গতিপথ বদলে যাচ্ছে। প্রবাহমান স্রোতধারা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। পঞ্চগড়ে আন্তঃসীমান্ত নদী ৮টি । মহানন্দা, করোতোয়া, ডাহুক, তালমা, টাঙ্গন, ঘোড়ামারা, বুড়ি তিস্তা এবং নাগর। তালিকা বহির্ভূত আন্তঃসীমান্ত ৯টি আন্তঃসীমান্ত নদী হলো বেরং, কুড়ুম, চাওয়াই, ছোট যমুনা, পাঙ্গা, আলাই কুমারী, ভাতা, গোবরা এবং সাঁও। পঞ্চগড়ের বিভিন্ন খালবিল থেকে উৎপত্তি হওয়া নদীগুলো হলো ভেরসা, নাগর, হাতুড়ি, বোরকা, ঝিনাইকুঁড়ি, ছেতনাই, শিঙ্গিয়া বা বহু নদী, হুয়ারী বা হঠাৎ নদী, কাঠগিরি, বাঘমারা, ডারি, চিলকা, বহিতা, শালমাড়া, তিস্তাভাঙ্গা ,পাইকানী, পাম নদী, পাথরাজ, আতরাই,ভূল্লি, হাইহরি, রসেয়া ,তীরনই ,রনচন্ডি, জোড়াপানি, সুই নদী, পেটকি, গাউনি, ভেরসি, বিশমনি, মামা ভাগিনা, কালিদহ, রাঙ্গাপানি এবং পাইলাভাসা ।
জেলা প্রশাসক মো: সাবেত আলী জানান, পঞ্চগড় জেলায় অনেক নদ নদী এখন শুকিয়ে গেছে। এসব নদী খনন করা প্রয়োজন। অনেক নদীর সীমানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে আমরা কাজ করছি। নদী রক্ষায় সর্ব স্তরের মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন রয়েছে।
বিডি প্রতিদিন/এএ