'স্বৈরাচার সরকার হটিয়ে বিপ্লবী সরকার এনেছি কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নিচ্ছেনা। তখনতো আশ্বাস দিয়েছে আমার চোখের চিকিৎসা করাবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাকে সরকারের পক্ষ থেকে কিংবা কোন সমন্বয়কও এসে দেখেনি। শুনেছি জুলাই বিপ্লব ফাউন্ডেশন থেকে অনেকে সহায়তা পাচ্ছে কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি কিছুই পেলাম না। আমি বেঁচেও যেন মৃত হয়ে পড়ে আছি পরিবারের বোঝা হয়ে।'
কথাগুলো বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারানো মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আজিজুল হক।
দৃষ্টিশক্তি হারানোর প্রায় ছয় মাস পার হলেও খবর নেয়নি কেউ। অনেকটা বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছেন তিনি। বেঁচেও মৃতের মত পড়ে আছেন বাড়িতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে পরিবারের নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
গত ১৮ জুলাই, নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে দুই চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আজিজুল হক। তিনি পৌনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
ব্রাহ্মনবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের তেজখালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের কামাল মিয়ার ছেলে আজিজুল। লেখাপড়ার পাশাপাশি মাধবদীতে একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করে সংসারের খরচ, বাবার চিকিৎসা ও ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ১৮ জুলাই কোটা বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে মাধবদী এলাকায় যান তিনি। এক পর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে তিনি গুরুতর আহত হন, তার দুই চোখে ও মুখের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগে। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে, পড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেষে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। দুই চোখেরই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন তিনি। আহত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসার খরচ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা জুগিয়েছেন।
দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আজিজুল তৃতীয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বড় ভাইয়ের ২০২০ সালে মৃত্যুর পর আজিজুল সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে একসময় ঐ বড় ভাইয়ের সঙ্গেই নরসিংদী আসেন আজিজুল। মাধবদী এমদাদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ৮ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এবং স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি নেন। দাখিল পাশ করার পর মাধবদী পৌনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এর মধ্যেই হারিয়ে ফেলেন বড় ভাইকে।
স্থানীয় মমিনুল ইসলাম বলেন, তার পরিবারের অসহায়ত্বের কথা যদি শুনলে বুক কেঁপে ওঠে। সেই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল। কিন্তু আজ সে চোখ হারিয়ে ঘরে বসে আছে। তার চিকিৎসার অর্থও কাছে নেই। বাংলাদেশ সরকার ও দেশবাসী যদি একটু সহায়তা করে তাহলে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে সুচিকিৎসা করানো যাবে।
আজিজুলের মা শুকতারা বেগম বলেন, 'আমাদের পরিবারের চলতেই অনেক কষ্ট হয়, এখন আমরা ছেলেকে কীভাবে চালাই। পাড়া প্রতিবেশী আমাদের সহযোগিতা করছে। বড় ছেলে মারা গেছে তারপর এই ছেলেই আমাদের সংসার চালাতো। কিন্তু আমার ছেলেকে এখন পরের সাহায্যে চলতে হয়। সরকার যদি উন্নত চিকিৎসা করিয়ে অন্তত একটা চোখও ভালো করতে পারতো তাহলেও আমার ছেলের জীবনটা চলতো।'
বাবা কামাল মিয়া বলেন, 'আমার এই ছেলেই পরিবারের অবলম্বন ছিল। কিন্তু বর্তমানে সে ঘরে অন্ধ হয়ে বসে আছে। সে তো মরা মানুষের মত পড়ে আছে কোন লোক আসেনা তাকে দেখতে। সরকারি কোনো সহযোগিতাও পেলাম না। আমরা অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছি। ভাবছিলাম সরকার আমাদের সহযোগিতা করবে কিন্তু কারো কোন সহযোগিতা পাই নাই। চিকিৎসার মাধ্যমে আমার ছেলের একটা চোখও যদি ভালো হতো, তাহলেও আমরা শান্তি পেতাম।'
এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বলেন, 'ইতোমধ্যে আজিজুলসহ মোট চারজনকে ৫ হাজার টাকা করে প্রাইজবন্ড দেয়া হয়েছে। এটা আমরা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগেই করেছি। সরকারি অনুদানের জন্য জেলা থেকে আমাদের কাছে যত ধরনের তথ্য চেয়েছে আমরা সরবরাহ করেছি। শীঘ্রই হয়তো সরকারি সহায়তা চলে আসার সম্ভাবনা আছে।'
বিডি প্রতিদিন/মুসা