সিঁড়ির মতো উঁচু থেকে নিচু বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূমি। বরেন্দ্রভূমির ভৌগোলিক এই বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একে বলা হয় ‘বারিন্দ ট্র্যাক্ট’। এঁটেল ও দোআঁশ হওয়ার কারণে এই মাটিতে ফলে নানা ফসল। আবার ইটভাটায় এই এঁটেল মাটির চাহিদাও তুঙ্গে। ফলে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় উর্বর জমির উপরিভাগের মাটি কেটে দেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। এই মাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে পুকুরও। জমির উপরিভাগের মাটি কাটা আইনে নিষিদ্ধ। এর পরও শুধু গোদাগাড়ীতে কমপক্ষে ২০টি মাটি সিন্ডিকেট দেদার মাটি কেটে ইটভাটায় ও পুকুর ভরাটের জন্য পাঠাচ্ছে। রাতে মাটি কেটে নেওয়ায় জমির মালিক কোনো টাকা পান না। তবে সিন্ডিকেটে চলে লাখ লাখ টাকার খেলা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই মাটি কাটছে এসব সিন্ডিকেট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়িহাট-ছয়ঘাটি এলাকায় মাটি কেটে বিক্রি করছেন মো. টিয়া আলম নামের এক ব্যক্তি। মাছমারা এলাকায় মাটি কাটছেন দুজন। কামারপাড়া, অভয়াসহ আশপাশের এলাকায় মাটি কাটেন একজন। ফুলতলা এলাকায় একজন, সিধনা দরগা এলাকায় একজন, ধনঞ্জয়পুরে অন্তত ১৫ ব্যক্তি মাটি কেটে বিক্রি করছেন ইটভাটা ও পুকুরে। এক সময় তারা দিনমজুরের কাজ করতেন, এখন প্রত্যেকে ৫ থেকে ১০টি পর্যন্ত ট্রাক্টরের মালিক হয়েছেন এই মাটি বিক্রি করেই। কামরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে তিনি সাহাব্দিপুর এলাকায় মাঠ থেকে মাটি কাটছেন। প্রতি ট্রাক্টর মাটির দাম নেবেন ১ হাজার ৪০০ টাকা। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই মাটি কাটা হবে। একইভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভরাট করা হবে পুকুর। কোনো অসুবিধা নেই। অভয়ার শাহিন জানান, চাহিদা অনুযায়ী মাটি সরবরাহ করতে পারবেন। সব মাটিই বরেন্দ্র এলাকার জমি থেকে দেওয়া হবে জানিয়ে শাহিন বলেন, ‘তবে খরচ একটু বেশি পড়বে। পুলিশ-প্রশাসন সবাইকে ম্যানেজ করেই মাটি কাটতে হবে। তা না হলে মাটি কাটা যায় না।’ গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ওদের কোনো যোগাযোগ নেই। টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। এগুলো এসি ল্যান্ডের এখতিয়ার। তিনি যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য বের হন, তখন আমরা সহযোগিতা করি।’ পবা উপজেলার বালিয়া এলাকায় মো. হানিফ নামের এক ব্যক্তির পাঁচ বিঘা আয়তনের একটি পুকুর ভরাট চলছে। পুকুর ভরাটের কাজটি করছেন নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মিলন হোসেন। যোগাযোগ করা হলে মিলন জানান, গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি এলাকার টিয়া আলম তার পুকুরে মাটি সরবরাহ করছেন বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে। টিয়া আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম বলেন, ‘যারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করার কথা বলছেন, তারা মিথ্যা বলছেন। আমরা খবর পেলেই অভিযান চালাব। কিছু ব্যক্তি পুকুর সংস্কার এবং উঁচু জমি চাষাবাদের উপযোগী করার জন্য কেটে বিক্রি করতে ইউএনও স্যারের কাছে অনুমতি চেয়েছেন। এটি আমাদের বিবেচনায় আছে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হায়াত বলেন, ‘ম্যানেজ করার অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়। আমরা বিষয়টি শক্তভাবেই দেখছি। সমস্যা হলো, এরা গভীর রাতে মাটি কাটে। তখন অভিযান চালানো কঠিন।