অনেক জল্পনাকল্পনার পর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গতকাল বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে পট পরিবর্তনের পর দুই প্রতিবেশী সরকারপ্রধান তৃতীয় একটি দেশে প্রথমবারের মতো এ বৈঠক করলেন। বিমসটেক সম্মেলনের সাইডলাইনে ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি ৪০ মিনিট কথা বলেছেন নিজেদের মধ্যে। এ সময় নরেন্দ্র মোদির কাছে বাংলাদেশ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছেন ড. ইউনূস। অন্যদিকে বাংলাদেশে দ্রুত অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় ভারতের প্রত্যাশার কথা ড. ইউনূসকে বলেছেন মোদি।
দুই দিনের সফরে বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে পৌঁছান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর জোট বিমসটেকের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতাদের জন্য আয়োজিত নৈশভোজে এক দফায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা হয় ড. ইউনূসের। কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের বেশ কিছু সময় কথাও বলতে দেখেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। গতকাল সকালে শীর্ষ সম্মেলন শেষ হলে সাইডলাইনে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি। আধা ঘণ্টার বেশি সময়ের আলোচনা শেষে প্রধান উপদেষ্টা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে একটি ছবি উপহার দেন। ছবিটি ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইতে হওয়া ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে অধ্যাপক ইউনূসকে নরেন্দ্র মোদির স্বর্ণপদক প্রদানের সময়ের।
ব্যাংককে ইউনূস-মোদি বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব ইস্যুতেই আলোচনা হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতে বসে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, এসব বিষয় বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তে হত্যা, তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উসকানিমূলক মন্তব্য করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন, যা ভারতে তার আশ্রয়ের সুযোগের অপব্যবহার। আমরা ভারত সরকারকে অনুরোধ করছি, তাকে (হাসিনা) আপনাদের দেশে থাকাকালে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নিন। এ সময় জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টেরও উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্দোলন চলাকালে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু। বিক্ষোভ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যেমন হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং বিশেষভাবে নেতৃস্থানীয়দের গ্রেপ্তার, হত্যা এবং তাদের মৃতদেহ লুকিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যকে ঘিরে উত্তেজনার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ভারতের সম্পর্ক দেশের সঙ্গে, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বৈঠকের ছবি যুক্ত করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জনাব মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে একটি গঠনমূলক ও জনকেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য আমাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।’ ব্যাংককের এ বৈঠকের দুই ঘণ্টার মধ্যে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপার উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ভারতের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ভারত তার আগের অবস্থানেই আছে। পাশাপাশি ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বাংলাদেশে দ্রুত অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে ভারত। ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক খারাপ হয়, এমন বক্তব্য পরিহার করতে আহ্বান জানান মোদি। ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মোদি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুবিধা বয়ে এনেছে। এ সময় তিনি বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি পরিবেশকে খারাপ করে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। বিক্রম মিশ্রি জানান, সীমান্তে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধ, বিশেষ করে রাতে সীমান্ত অতিক্রম ঠেকাতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকের বিষয়ও উল্লেখ করেছেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল প্রমুখ।