নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নটিকে দুই ভাগ করে রেখেছে পদ্মা নদী। নদীর পশ্চিম পাশে একটি অংশ এবং নদীর পূর্ব পাশে আরেকটি অংশ। পূর্ব অংশে ট্রলারে করে যেতে সময় লাগে এক ঘণ্টারও বেশি। এ চরে রয়েছে পাঁচটি গ্রাম। গ্রামগুলো হলো- কবিরপুর চর, মনসুরাবাদ, নর্থ চ্যানেল, ৪৬ দাগ ও ৩৮ দাগ। এসব গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। একসময় এ চরের বেশির ভাগ জমিই ছিল পতিত। অল্পসংখ্যক জমিতে বাদাম আর ভুট্টার চাষ হতো। কিন্তু গত বছর চরগুলোতে বিপ্লব ঘটেছে। চরজুড়ে এখন নানা সবজির সমাহার। মাঠের পর মাঠ ভরে আছে বিভিন্ন ধরনের সবজিতে। রয়েছে মিষ্টি কুমড়া, শিম, টমেটো, বেগুন, লাউ, লালশাক, পুঁইশাক, ধনেপাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। বাড়ির আঙিনার পাশাপাশি চরের জমিতে চাষ করা হয়েছে এসব সবজি। স্থানীয় এনজিও একেকের সহযোগিতায় বদলে গেছে চরের সার্বিক চিত্র। স্থানীয়রা জানান, চরাঞ্চলের মানুষ আগে পদ্মা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অল্পসংখ্যক অধিবাসী কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। চরের বেশির ভাগ জমি ছিল পতিত এবং অনাবাদি। হাজার হাজার বিঘা জমিতে কোনো ফসলই হতো না। গত বছর স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আমরা কাজ করি (একেকে) চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সবজি চাষ প্রকল্প হাতে নেয়। এরই অংশ হিসেবে ৫০০ কৃষক বাছাই করে তাদের সবজি উৎপাদনে প্রশিক্ষণ, বীজ, সার ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করে।
বিষমুক্ত সবজি আবাদে কৃষকদের পরামর্শসহ দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। ফলে প্রথমবারের মতো চরাঞ্চলে শুরু হয় সবজি চাষ। একেকের সহযোগিতায় বিশাল এলাকাজুড়ে শুরু হয় সবজিবিপ্লবের। প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে আবাদ করা হয় নানা ধরনের সবজি। কবিরপুর চর এলাকার আবুল হাসান বলেন, ‘আগে আমি তেমন কিছুই করতাম না। গত বছর কয়েক বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়া লাগিয়েছি। ব্যাপক ফলন পেয়েছি। সঙ্গে ধনিয়া পাতা, মুলার আবাদ করেছি। আমি সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ করেছি। এখন মাঠে মিষ্টি কুমড়া রয়েছে, যা বিক্রি করে আরও টাকা পাব।’ কৃষক মজিবর শেখ, রজব মোল্যা, নুরু শেখ, আনোয়ার হোসেন জানান, ‘চরের বালু মিশ্রিত পতিত জমিতে আগে কিছুই হতো না। এখন আমরা এই পতিত জমি কাজে লাগিয়ে সবজি চাষ করছি। একই খেতে মিশ্র সবজি চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছি। চরের জমিতে সবজি চাষে তেমন কোনো খরচ নেই।’ নজরুল ইসলাম নামের আরেক চাষি জানান, ‘এক বিঘা জমিতে বেগুন লাগিয়েছেন, সেই বেগুন বিক্রি করে লাখ টাকার ওপরে লাভ করেছি। স্বপ্নেও কোনো দিন ভাবিনি এ চরে সবজি হবে।’ কৃষকরা জানান, চরে চাষের খরচ ও শ্রমিকের তেমন কোনো খরচ নেই, তুলনামূলক উৎপাদক খরচ কম। ফলে সবজি চাষ করে তারা বেশ লাভবান হচ্ছেন।’ চরে উৎপাদিত সবজি ট্রলারে করে শহরে এনে বাজারজাত করা হচ্ছে। অনেকেই আবার চর থেকে সবজি কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছে। গত বছর থেকে চরাঞ্চলে ইকোলজিক্যাল ফার্মিং পদ্ধতিতে নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে একেকের পক্ষ থেকে ৫০০ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২৫৪টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, সবজি চাষের ওপর ৩০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, বাণিজ্যিক পর্যায়ে জৈবসার উৎপাদনে ৩টি প্লট স্থাপন, ১০০ উদ্যোক্তার প্রণোদনা প্রদান ছাড়াও বিভিন্ন সহযোগিতা করা হয়। আমরা কাজ করি, একেকের নির্বাহী পরিচালক এম এ জলিল বলেন, চরের পতিত ও অনাবাদি জমিগুলোকে কাজে লাগিয়ে সেখানে সবজি চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। গত বছর ব্যাপক হারে সবজি হয়েছে চরগুলোতে। ফলে চরজুড়ে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।’