জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্ম ১৯১৫ সালের ৫ জুন। সে হিসাবে বর্তমান বয়স ১০৯ বছর। তবে তাঁর দাবি বয়সটা ১১৬ বছর হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক তিনি। নাম তাঁর আবদুল মান্নান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হিসেবে ব্রিটিশ সরকার থেকে এখনো নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের বড় আজলদী গ্রামের আবদুল রহমান ও আতর বানু দম্পতির ছেলে আবদুল মান্নান। বয়স শত বছর পেরোলেও চোখে দেখেন স্পষ্ট, কথাও বলেন কোনো রকম জড়তা ছাড়াই। শত বছর পার করা এ মানুষটি কিছুদিন আগেও কারও সাহায্য ছাড়াই চলাফেরা করতেন। কয়েক মাস আগে পায়ে সমস্যা হওয়ায় হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে হচ্ছে। বাড়িতে গিয়ে কথা হয় আবদুল মান্নানের সঙ্গে। শত বছর পার করা এ সৈনিক এখনো ভোলেননি তখনকার স্মৃতি। বাংলার পাশাপাশি কিছুটা ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। ইংলিশ ভাষাটা তিনি শিখেছেন ইংরেজদের কাছ থেকেই। ঘরে থাকা পুরনো ট্রাংক থেকে বের করে দেখান সে সময়কার কাগজপত্র, যুদ্ধ শেষে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিঠির জবাব। দেখান যুদ্ধকালীন পোশাকও। পোশাকে এখনো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন র্যাংক মেডেল ঝোলানো আছে। সেই যুদ্ধের এমন তিনটি পোশাক ও বিভিন্ন কাগজপত্র এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। ট্রাংকে থাকা এসব কাগজপত্র ও পোশাকে কাউকে হাত দিতে দেন না। মান্নান বলেন, ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর বাবা আবদুর রহমান স্থানীয় বাজারে গিয়ে শোনেন ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীতে লোক নেওয়ার জন্য ঢোল পিটিয়েছে। যারা আগ্রহী, তাঁরা যেন কিশোরগঞ্জ সদরের ডাকবাংলোতে গিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এ ঘোষণা শুনে মান্নানের বাবা তাঁকে সেখানে পাঠান। ওজন, স্বাস্থ্য এবং উচ্চতার মাপে প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে যান মান্নান। এরপর লাইন থেকে সৈনিক বাছাই করতে আসেন এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা। তিনি এসেই সবার বুকে জোরে থাপ্পড় মারতে থাকেন। থাপ্পড় খেয়ে অনেকেই মাটিতে পড়ে গেলেও মান্নান বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে উত্তীর্ণদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত এলাকা হাসনাবাদে। প্রশিক্ষণ শেষে সেখান থেকে ৪ হাজার সৈনিক সমুদ্রপথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। বড় একটি জাহাজে ছয় মাসের খাবার নিয়ে কলম্বোর দিকে রওনা দেন তাঁরা। সেই জাহাজে অস্ত্র, গোলাবারুদসহ চারটি কামান বিভিন্ন দিকে তাক করা ছিল। জাহাজে শুধু ভারত উপমহাদেশীয় সৈনিকরা ছিল। জাহাজটি টানা এক মাস আটলান্টিক মহাসাগরে তাঁদের নিয়ে মহড়া দেয়। সেখানে সৈনিকদের বলা হলো, পানিপথে অনেকেই আক্রমণ করতে আসবে। এক মাস পর আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আবার কলম্বোয় ফিরলেন তারা। তখন কলম্বোর কাছাকাছি জার্মানির একটি জাহাজকে তাঁরা ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে আবার হায়দরাবাদ নিয়ে আসা হয় তাঁদের। ছুটি শেষে করাচি হয়ে মিয়ানমারের দিকে রওনা দেন মান্নান। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে হিমালয়ের নিচ দিয়ে মিয়ানমার পৌঁছায় তাদের সৈনিক দলটি। সেখানে কিছু কিছু স্থানে শত্রুপক্ষের সংবাদ পেয়ে গুলিও করেন। মিয়ানমার গিয়ে ক্যাম্প করার পরই তাঁরা সংবাদ পান হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলা হয়েছে। তখনই যুদ্ধ শেষ হয়। মান্নান জানান, হিরোশিমায় যখন বোমা হামলা হলো, তখন ব্রিটিশ সৈনিকরা আমাদের ভারতীয়দের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তারা চলে যেতে থাকে। পাঁচ-সাতজন করে একেকটি দল ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছিল। তখন আমরা জানতে চাইলাম আপনারা কোথায় যান? তখন ভারতীয় সৈনিকরা আমাদের কাছে সত্যটা গোপন করে জানায়, তারা কোয়ার্টারে যাচ্ছে। তবে সত্যিটা হলো, সব ব্রিটিশ সৈনিক তখন আমাদের ক্যাম্পে রেখেই ফ্লাইটে লন্ডন চলে যাচ্ছিল। তিনি বলেন, সেখান থেকে আমাদের আবার হায়দরাবাদে নিয়ে আসা হয়। এরপর ৫০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাড়িতে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লেখার গল্পটা শুনতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেই যুদ্ধে গিয়ে আমি তেমন কিছুই পাইনি। এমনকি প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাইনি। এরপর মন চাইল ব্রিটিশ সরকারের কাছে চিঠি লেখার। কিন্তু আমি তো পড়াশোনা জানি না। ইংলিশ বলতে পারি, তবে লিখতে পারি না। তাই শরণাপন্ন হলাম আমাদের এলাকার আলতাফ মৌলভীর। তিনি ইংরেজিতে খুব পারদর্শী ছিলেন। তখন ছিল এরশাদ সরকারের আমল। ওই সময় লিখেছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আপনার ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আমাদের ফেলে কমান্ড ছেড়ে চলে গেল। অথচ আমাকে কিছুই বলে যায়নি। আমার অধিকার আমি পাইনি। যুদ্ধ জয় করে আপনার দেশের সৈন্যরা আমাদের কাছে কিছু না বলে চুপিচুপি সেখান থেকে চলে গেল। এখন লন্ডন শহরে তারা মাথা উঁচু করে হাঁটে। আর আমি যে আপনাদের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিলাম, আমাকেও তো প্রাপ্য সম্মানটুকু দেননি আপনারা। কোনো খোঁজখবরও রাখেননি।’ চিঠির একটি কপি তিনি সে সময়ে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও আরেকটি কপি ব্রিটিশ হাইকমিশনে দেন। কিছুদিন পর ব্রিটিশ রানির চিঠির জবাব আসে তাঁর কাছে। রানি লেখেন, ‘আপনার বিষয়টি দেখার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বলা হয়েছে। ব্রিটিশ অ্যাম্বাসি থেকে আমাকে চিঠি দেওয়া হলো এই বলে যে, আপনার বিষয়টি ব্রিটিশ সোলজার বোর্ড থেকে অচিরেই সমাধান করা হবে।’
এরপর সে সময়ে ময়মনসিংহের কাচারিঘাট সোলজার বোর্ডে তাঁকে ডেকে নিয়ে ৩ হাজার ৫৩৮ টাকা ৭৭ পয়সা দেওয়া হয়। এরশাদের পতনের পর কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় মান্নানের ভাতা। পরে আবারও ময়মনসিংহের কাচারিঘাট সোলজার বোর্ড থেকে তিনজন লোক এসে তাঁর খোঁজখবর নেন। এখন নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন তিনি। ভাতাটা বছরে দুবার দেওয়া হয়। একবার দেওয়া হয় ১৫ হাজারের মতো এবং আরেকবার দেওয়া হয় ৩২ হাজারের মতো। এই ব্রিটিশ যোদ্ধা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এলাকার লোকজনকে যুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতে পাঠিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলেও তিনি সনদ পাননি। জীবন সায়াহ্ণে এসে শেষ ইচ্ছার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি আর ভাঙাচোরা ঘরটি যেন পাকা করে দেওয়া হয়। মান্নানের ছোট ছেলে রোমান বলেন, আমার বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক এ পরিচয়টা আমাদের জন্য গর্বের।’