আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২৮)
উল্লিখিত আয়াতে মুহাম্মদ (সা.)-কে এমন দুটি গুণবাচক শব্দে ভূষিত করেছেন, যা আল্লাহ নিজের জন্য ব্যবহার করেছেন।
তা হলো রাউফুন ও রাহিমুন। সুরা বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজের ব্যাপারে বলেছেন, ‘ইন্নাল্লাহা বিন্নাসি লারাউফুর রাহিম’ (অবশ্যই আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু)। সুবহানাল্লাহ! এর দ্বারা নবীজি (সা.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সুরা ইনশিরাহর ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ওয়ারাফা‘না লাকা জিকরাক’।
অর্থ : আর আমি আপনার আলোচনা বা মর্যাদাকে উচ্চ করেছি। প্রকৃতপক্ষে কোরআনের একাধিক স্থানে আল্লাহ নিজের জিকিরের সঙ্গে সঙ্গে রাসুলে করিম (সা.)-এর আলোচনা নিয়ে এসেছেন। যেমন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এই বাণী মুখে বলা ও অন্তরে বিশ্বাস করার সঙ্গে সঙ্গে ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ মুখে বলা ও অন্তরে বিশ্বাস করলেই ব্যক্তি মুমিন হয়। এটাই ইসলামের বিধান।
মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহকে স্বীকার না করে শুধু ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র জিকির শতবার করলেও কেউ মুমিন হতে পারবে না।
নামাজের আজানে ও ইকামতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে সাক্ষ্য দেওয়ার পর ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলে সাক্ষ্য দিতে হয়। জুমা, দুই ঈদ, বিয়ে, ওয়াজ ইত্যাদির খুতবায় আল্লাহ তাআলার জিকিরের সঙ্গে রাসুলে করিম (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করতে হয়। মসজিদে প্রবেশকালে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিল্লাহ’ বলতে হয়। নামাজের তাশাহুদ পাঠ করার সময় ‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তায়্যিবাত’ পড়ার পর ‘আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ পড়তে হয়।
শেষ বৈঠকে এরপর রাসুলে করিম (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করতে হয়। এভাবে আল্লাহ নিজের স্মরণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-এর স্মরণকে আবশ্যক ও সুউচ্চ করেছেন।
পূর্ববর্তী সব নবী ও রাসুলের কাছ থেকে আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)-এর আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন এবং পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থে তাঁর গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। যেমন তাওরাতে আছে, ‘তোমাদের প্রভু ঈশ্বর তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকে আমার মতোই একজন পয়গাম্বর উত্থিত করবেন, তাঁর কথা তোমরা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে।’
বৌদ্ধশাস্ত্র ‘দিগা-নিকায়া’তে ‘আনন্দ বৌদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার মৃত্যুর পর কে আমাদের উপদেশ দেবে? বুদ্ধ বললেন, আমিই একমাত্র বুদ্ধ বা শেষ বুদ্ধ নই। যথাসময়ে আরেকজন বুদ্ধ আসবেন। আমার চেয়েও তিনি পবিত্র ও অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মমত প্রচার করবেন। আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁকে আমরা কিভাবে চিনব? বুদ্ধ বললেন, তাঁর নাম হবে মৈত্রিয় (মুহাম্মদ)।
ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.) দুজন মিলে পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের কাজ শেষ করার পর দোয়া করেন। দোয়ায় তাঁরা বলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত করো এবং আমাদের বংশধর থেকে তোমার এক অনুগত উম্মত করো। আমাদের ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসুল প্রেরণ করো, যে তোমার আয়াতগুলো তাদের কাছে তিলাওয়াত করবে; তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১২৮-১২৯)
আতা ইবনে ইয়াসার বলেন, আমি একবার আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সঙ্গে দেখা করলাম এবং বললাম, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গুণ বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, গুণ! কোরআনে উল্লিখিত তাঁর কতক গুণের উল্লেখ তাওরাতেও আছে। তা হলো, হে নবী! আমি আপনাকে শাহিদ (সাক্ষ্যদাতা), মুবাশশির (সুসংবাদদাতা) ও নাজির (সতর্ককারী) হিসেবে প্রেরণ করেছি। আপনি উম্মিদের আশ্রয়স্থল, আমার বান্দা ও রাসুল। আমি আপনার নাম ‘মুতাওয়াক্কিল’ (ভরসাকারী) রেখেছি। আপনি অসচ্চরিত্র ও কঠোর নন এবং বাজারেও ঘুরাফিরা করেন না। আপনি মন্দের জবাবে মন্দ করেন না, বরং মাফ করে দেন। আল্লাহ আপনাকে তুলে নেবেন না, যে পর্যন্ত আপনার জাতি পথভ্রষ্টতা মুক্ত না হয়ে যায় এবং তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ না বলে। আল্লাহ আপনার মাধ্যমে অন্ধ চোখগুলোকে দৃষ্টিশক্তি, বধির কর্ণগুলোকে শ্রবণশক্তি এবং পথভ্রান্ত অন্তরগগুলোকে সৎপথের দিশা দান করবেন।
আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘গোটা সৃষ্টিজগতের জন্য আপনাকে করুণার মূর্তপ্রতীক হিসেবে পাঠিয়েছি।’ তাফসিরে রুহুল মাআনিতে উল্লিখিত আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে, রাসুলে আকরাম (সা.) সব সৃষ্টির জন্য রহমত বা অনুগ্রহ। এর মর্মার্থ হলো সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর ওপর রহমতে ইলাহি বর্ষিত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি একটি মাধ্যম।
মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামত দিবসে সব মানুষের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম বের হবো এবং আমিই সবার নেতা হবো। সবার পক্ষ থেকে আমিই কথা বলব...ওই দিন সর্বাধিক সম্মান আমারই হবে এবং সব কিছুর চাবি আমারই হাতে থাকবে।’ দুনিয়ায়ও আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করেছেন। একবার মুনাফিকরা মহানবী (সা.)-এর সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকার করলে আল্লাহ ধমকের সুরে বলেন, ‘তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা দাবি করে যে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তা প্রত্যাখ্যান করতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়?’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬০)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যে লোক রাসুলের হুকুম মান্য করল সে আল্লাহর হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে তাদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিনি।’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৮০)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা পরস্পরকে যেভাবে আহবান করে থাকো রাসুলকে সেভাবে আহবান কোরো না।’
(সুরা : নুর, আয়াত : ৬৩)
আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আরো বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু কোরো না এবং তোমরা একে অপরের সঙ্গে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলো, তাঁর সঙ্গে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বোলো না। এতে তোমাদের কর্মফল নিষ্ফল হয়ে যাবে, তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।’
(সুরা : হুজরাত, আয়াত : ২)
এভাবেই মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলের ওপর তাঁর মর্যাদাকে সুউচ্চ করেছেন।
লেখক : ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, গবেষক ও গ্রন্থ প্রণেতা
বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন