ইসলাম মানুষ ইতিবাচক হওয়ার এবং ইতিবাচক মনোভাব পোষণের শিক্ষা দেয়। নেতিবাচক মনোভাব ইসলামে অনুমোদিত নয়। কেননা ইতিবাচক মনোভাব মানুষের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে। অন্যদিকে মন্দ চিন্তা ও মনোভাব মানুষের কর্মস্পৃহা নষ্ট করে, মানুষকে জীবন-জগতে পিছিয়ে দেয়।
ইতিবাচক মনোভাবের অর্থ
কোনো কিছুর ক্ষেত্রে মন্দ ধারণা ও চিন্তার ওপর উত্তম ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়াকে ইতিবাচক মনোভাব বলা হয়। ড. সালিহ বিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘ইতিবাচক মনোভাব হলো মানব হৃদয়ের প্রশস্ততা, চিন্তা সুন্দর করা এবং অতি উত্তম, উত্তম ও ভালো—যে কথাই শুনুক তার ভালো ব্যাখ্যা গ্রহণ করা।’ (নুদরাতুন নাঈম : ৩/১০৪৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিম্নোক্ত হাদিস থেকেও ইতিবাচক মনোভাবের অর্থ স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন, ‘শুভ-অশুভ নির্ণয়ে কোনো লাভ নেই, বরং শুভ আলামত গ্রহণ করা ভালো।
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, শুভ আলামত কী? তিনি বলেন, ভালো কথা, যা তোমাদের কেউ শুনে থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৫৪)
ইতিবাচক মনোভাব আল্লাহর প্রতি সুধারণা
উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ফাল ও তিয়ারের (শুভ আলামত ও কুসংস্কারের) মধ্যে পার্থক্য হলো, শুভ আলামত বা ইতিবাচক মনোভাব আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করার নামান্তর। আর তিয়ার বা কুসংস্কার হলো আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা। তাই ইসলামে অপছন্দনীয়। (ফাতহুল বারি : ১০/২২৫)
আল্লামা তিব্বি (রহ.) বলেন, শুভ আলামতের ব্যাপারে নমনীয়তা প্রদর্শন ও কুসংস্কার থেকে নিষেধ করার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কিছু দেখে ভালো ধারণা করে, তবে সে তাঁর লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হবে। আর যদি খারাপ মনে করে, তবে সে তাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজ পথে চলবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি খারাপ ধারণাকে গুরুত্ব দেয় এবং থেমে যায়, তবে সে কুসংস্কারে আক্রান্ত হলো। (ফাতহুল বারি : ১০/২২৫)
কোরআনে ইতিবাচক মনোভাবের তাগিদ
পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষকে ইতিবাচক মনোভাব পোষণের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন—মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।
আর আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী। অতএব কিছুকালের জন্য তুমি তাদের উপেক্ষা কোরো।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৭১-১৭৪)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের সঙ্গে সত্ভাবে জীবনযাপন করবে; তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
আল্লাহ আরো বলেন, ‘কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।’ (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে ইতিবাচক মনোভাব
মহানবী (সা.)-এর জীবনও ছিল ইতিবাচকতায় পরিপূর্ণ। তিনি নিজে যেমন ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন, তেমনি অন্যকেও ইতিবাচক মনোভাব পোষণে উৎসাহিত করতেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় তিনি ও আবু বকর (রা.) পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। মক্কার মুশরিকরা পাহাড়ের গুহার সামনে উপস্থিত হলে তিনি আবু বকর (রা.)-কে অভয় দিয়ে বলেন, ‘বিষণ্ন হয়ো না, আল্লাহ তো আমাদের সঙ্গেই আছেন।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪০)
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তম আলামত গ্রহণকে পছন্দ করতেন। কিন্তু তিনি কোনো কিছুকে কুলক্ষণ মনে করা অপছন্দ করতেন।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫৩৬)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.)-এর অভ্যাস ছিল যে পীড়িত ব্যক্তিকে দেখতে গেলে বলতেন, কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই, ইনশা আল্লাহ গোনাহ থেকে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬১৬)
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন মক্কার লোকেরা সুহাইল ইবনে আমরকে (তখনো তিনি মুসলিম হননি) প্রতিনিধি পাঠান, তখন নবীজি (সা.) বলেন, এ যে সুহাইল ইবনে আমর! আল্লাহ তোমাদের কাজ সাহাল (সহজ) করে দেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৩২)
ইতিবাচক মনোভাবের উপকার
আল্লামা মাওয়ার্দি (রহ.) ইতিবাচক মনোভাব পোষণের বহু উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। যার মধ্যে ১০টি হলো—
১. ব্যক্তির মনোবল বৃদ্ধি ও সাহস বৃদ্ধি পায়। ফলে সহজে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে।
২. মানসিক প্রশান্তি লাভ হয় এবং সৌভাগ্যের দুয়ার খোলে।
৩. ব্যক্তির কর্মস্পৃহা ও প্রাণচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পায়।
৪. ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণকারী। সুতরাং সে আল্লাহর ইবাদতেও অগ্রগামী।
৫. মানুষের শারীরিক সুস্থতার ওপর ইতিবাচক মনোভাবের ব্যাপক প্রভাব আছে। কেননা মানসিক দুর্বলতা শরীরকে দুর্বল করে দেয়।
৬. ব্যক্তি ইতিবাচক মনোভাব পোষণের মাধ্যমে নবীজি (সা.) ও তাঁর নির্দেশনার অনুসরণ করে।
৭. ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্তিকে কাজে-কর্মে সুদৃঢ় করে।
৮. ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্তির হতাশা দূর করে এবং তাকে আশান্বিত করে।
৯. ইতিবাচক মনোভাব জীবনের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক।
১০. ইতিবাচক মনোভাবের মাধ্যমে ব্যক্তি ভাগ্যের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে, যা পূর্ণ ঈমানের সাক্ষ্য বহন করে। (আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বিন, পৃষ্ঠা ৩১৬)
নেতিবাচক মনোভাব অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য
মুমিন ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী হয়। আর অবিশ্বাসীরা হয় নেতিবাচক মনোভাবের অধিকারী। তারা হয় কুসংস্কারে বিশ্বাসী। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে তারা বলে—এটা তোমার কাছ থেকে। বোলো, সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে। এই সম্প্রদায়ের হলো কী যে তারা একেবারেই কোনো কথা বোঝে না!’
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৭৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীদের বিভ্রান্তির শিকার বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা বলল, তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা আছে তাদেরকে আমরা অমঙ্গলের কারণ মনে করি। সালেহ বলল, তোমাদের শুভাশুভ আল্লাহর ইচ্ছাধীন, বস্তুত তোমরা এমন এক সম্প্রদায় যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৪৭)
আল্লাহ তাআলা সবাইকে নেতিবাচক মনোভাব ত্যাগ করে ইতিবাচক মনোভাব পোষণের তাওফিক দিন। আমিন।
বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন