ছেলেবেলায় নৌকায় চড়ে বাবার সঙ্গে হাটে যেতাম। বিল ভর্তি শাপলা ফুল ঠেলে এগিয়ে যেত নৌকা। কখনো কখনো মাঝি খুব জোর দিয়ে বৈঠা বাইতেন। আবার কখনো আরামে বসে শুধু দিক ঠিক রাখতেন। তখন বুঝতাম না এর রহস্য কী? এখন বুঝতে পারি, জোয়ার এলে মাঝিকে শুধু নৌকার দিক ঠিক রেখে বসে থাকলেই হয়। স্রোতই নৌকা টেনে নেয়। কিন্তু জোয়ার না থাকলে কিংবা স্রোতের বিপরীতে বৈঠা বাইতে হলে মাঝির প্রাণ বেরিয়ে যায়। মাবুদ রব্বানার প্রেমনদীও একই রকম। যখন রহমতের জোয়ার আসে, তখন বান্দাকে শুধু কলব স্থির রেখে আল্লাহমুখী হয়ে বসে থাকতে হয়। তখন বান্দা নিঃশ্বাস নিলেও অফুরন্ত লাভ। মাহে রমজান হলো মাবুদের প্রেমের জোয়ার। এ মাসে আল্লাহতায়ালা রহমতের দরজাগুলো খুলে দেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকটা কাজ তার নিজের জন্য। তবে রোজা ছাড়া। কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। আর রোজা হচ্ছে ঢালের মতো। কাজেই কেউ যখন রোজা রাখে, তখন সে যেন কোনো অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। কেউ যদি তাকে গাল-মন্দ করে অথবা লড়াই করতে আসে, তবে সে যেন বলে, আমি রোজাদার।’ (বুখারি ও মুসলিম।) মুসলিম শরিফের অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আদম সন্তানের সব কাজের সওয়াব ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয় কিন্তু রোজার কথা ভিন্ন। কেননা রোজা আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব।’ (মুসলিম।) রোজা এমন এক বরকতময় ইবাদত, যার সঙ্গে অন্য কোনো ইবাদতেরই তুলনা হয় না। রোজাদারের জন্য মহান রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে রয়েছে বিশেষ পুরস্কার এবং মর্যাদা। এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে হজরত ওমরের (রা) বর্ণিত হাদিসে। রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে মানুষের আমল বা কাজ সাত রকমের। দুই রকমের কাজ এমন যে, তার দুটি অনিবার্য ফল রয়েছে। আর দুই রকমের কাজ এমন যে, তার ফল কাজের সমান। আর এক রকমের কাজের ১০ গুণ সওয়াব রয়েছে। আর এক রকমের কাজের সওয়াব ৭০০ গুণ। আর এক রকমের কাজের সওয়াবের পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেন না। প্রথম দুটি হলো- যে ব্যক্তি একাগ্র চিত্তে আল্লাহর ইবাদত করে, কাউকে তার সঙ্গে সমকক্ষ করে না এবং এ অবস্থায় আল্লাহর কাছে উপস্থিত হয়, তার জন্য জান্নাত অনিবার্য। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করা অবস্থায় তাঁর কাছে উপস্থিত হয়েছে, তার জন্য জাহান্নাম অনিবার্য। যে ব্যক্তি কোনো খারাপ কাজ করে সে তার এক গুণ শাস্তি পায়। আর যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজ করার ইচ্ছা করে কিন্তু কাজটি করে না- সে ওই কাজ করার এক গুণ সওয়াব পায়। আর যে ব্যক্তি ভালো কাজ সম্পাদন করে, সে তার কাজের ৭০০ গুণ পর্যন্ত সওয়াব পায়। আর রোজা আল্লাহর জন্য হয়ে থাকে। এর সওয়াবের পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেন না। (তাবারানি ও বায়হাকি।) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আর একটি হাদিস থেকে জানা যায়, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ও কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আমার প্রতিপালক, একে আমি পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত রেখেছিলাম। কাজেই তার সম্পর্কে আমার সুপারিশ কবুল করো। আর কোরআন বলবে, আমি একে রাতে আরামের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার সম্পর্কে আমার সুপারিশ কবুল করো। এরপর তাদের দুজনের সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ ও হাকেম আল মুসতাদরাক।) হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস শরিফের উল্লেখ করা এখানে আবশ্যক। তিনি বর্ণনা করেন, রসুলে পাক (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে রমজান মাস এসেছে। এটা একটা কল্যাণময় মাস। আল্লাহতায়ালা তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাগুলো খোলা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয়, খোদাদ্রোহী শয়তানগুলোকে শেকল পরানো হয়। এ মাসে এমন এক রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এই মাসের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়, সে প্রকৃত অর্থে সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হয়। (সুনানে নাসায়ি ও শুআবুল ইমান।)
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর, www.selimazadi.com