রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বেনারসি পল্লীর তাঁতের খুটখাট শব্দ থেমে গেছে। ফলে জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে এই পল্লী। নেই হাঁক-ডাক। তবে বেনারসি ঘিরে পল্লী এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ওই সব প্রতিষ্ঠানে পল্লীর তৈরী কোন বেনারসি নেই। যে সব বেনারসি রয়েছে তার অধিকাংশ ভারত থেকে আসা। কিছু রয়েছে ঢাকা মিরপুরের। এটা এক ধরনের প্রতারণা বলে মনে করছেন ভোক্তারা। স্থানীয় তাঁতীদের মতে ভারতীয় শাড়ির অগ্রাসন বন্ধ করতে পারলে আবারও প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসবে পল্লীতে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের তালুক হাবু গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে একটি তাঁতও সচল নেই। কয়েকজন স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছেন জং ধরা তাঁত। অথচ এক যুগ আগে হাবু তালুক গ্রাম বেনারসি তাঁতের খুটখাট শব্দে মুখর ছিল। এখন নীরব ওই গ্রাম। তাঁতীদের সাথে কথা হলে তারা অতীত মনে করে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। তবে বেনরসিকে ঘিরে গজঘণ্টা ও বুড়ির হাট এলাকায় গড়ে উঠেছে বড় বড় কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের আগে পিছে বেনারসি কথাটি লেখা রয়েছে। কিন্তু সেখানে রংপুরের তৈরি কোন বেনারসি নেই।
তালুক হাবু গ্রামের বেনারসি পল্লীর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রহমান জানান, ঢাকা থেকে কাজ শিখে ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথম বেনারসি শাড়ি প্রস্তুত করতে শুরু করেন পরিবারের সদস্যসহ কয়েকজন কারিগর দিয়ে। তার দেখাদেখি অনেকেই বেনারসি শাড়ি তৈরি শুরু করেন। এক সময় ওই গ্রামে ৫০০ বেশি তাঁতে বেনারসি প্রস্তুত হত। প্রায় দুইশ উদ্যোক্তা এই শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকের হাঁকডাকে মুখর ছিল বেনারসি পল্লী। এক যুগ আগেও হাবু গ্রামের প্রায় সবাই বেনারসির সাথে যুক্ত ছিল। পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও কারিগর-শ্রমিকের পদচারণায় মুখর ছিল বেনারসি পল্লী। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি মার থেকে শুরু করে ২০১৪ সাল থেকে। ভারতীয় শাড়ির অগ্রাসন, শ্রমিক সংকট, সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা, স্থানীয় ভাবে সুতা না পাওয়া, ডাইং মেশিন না থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যায় এই শিল্পটি হোচট খেতে থাকে। ফলে তাঁত শিল্পী ঝরে পড়েন। বর্তমানে কোন তাঁত চলছে না পল্লীতে। এখানকার উৎপাদিত শাড়ি ধরন বা নকশার ওপর ভিত্তি করে ব্রোকেট কাতান, পিরামিড কাতান, মিরপুরি রেশমি কাতান, বেনারসি কসমস, চুনরি কাতান, প্রিন্স কাতান ইত্যাদি নামকরণ করা হয়েছিল। মূল্য দেড় হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল একেকটি শাড়ির দাম।
বেনারসি পল্লীর প্রথম উদ্যোক্তার আবদুর রহমান আরও বলেন, সরকারি কোন পৃষ্ঠপোষকতা তারা পাননি। এছাড়া সুতার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। ডাইং মেশিন না থাকায় শাড়ি তৈরি করে তাদের ঢাকায় গিয়ে ডাইং করাতে হয় এতে খরচ ও সময় দুটোই ব্যয় হয়। এছাড়া স্থানীয় ভাবে গড়ে উঠা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় শাড়ির ঢুকে পড়ায় এখানকার শাড়ি খোচট থেকে শুরু করে। ফলে বেনারসি পল্লীর অনেকেই ব্যবসা পরিবর্তন করেছেন। স্মৃতি হিসেবে এখনও তার ১৩টি তাঁত রয়েছে।
তবে তিনি আশা জাগানিয়া কথা শুনালেন তা হল বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বেনারসি শাড়ি আসা অনেক কমেছে। এই অবস্থায় তার সাথে এবং আরও কয়েকজন তাঁতির সাথে মহাজনরা যোগাযোগ করছেন আবার শাড়ি উৎপাদনের জন্য। তিনি আশা করেন আবারও হয়ত বেনারসি পল্লী তাঁতের খুটিখাট শব্দে মুখর হয়ে উঠবে।
পল্লীর পাশে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শমীম বেনারসি ম্যানেজার বলেন, তিনি একজন তাঁতি। তার তাঁত এখন বন্ধ রয়েছে। তবে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় ভাবে তৈরি বেনারসি নেই। যেসব বেনারসি রয়েছে সেসব বাইরের। তিনি আশাবাদি পুনরায় তাঁত চালু হবে পল্লীতে।
বুড়িরহাটের ব্যবসায়ী তাজিদুল ইসলাম বলেন, বেনারসি পল্লী আগের অবস্থা নেই। বেনারসি শাড়ির নাম দিয়ে কয়েকটি বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তারাই বেনারসি নামটিকে টিকিয়ে রেখেছেন ব্যবসার স্বার্থে।
বেনারসি শাড়ির উৎপত্তি সম্পর্কে জানা গেছে, এই শিল্পের আভির্ভাব ভারতের বেনারস শহরে। মুসলিম তাঁতিরা বংশপরম্পরায় এই শাড়ি তৈরি করে আসছেন। কিন্তু ঠিক কবে থেকে এর সূচনা হয়েছে জানা না গেলেও ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারতের বেনারস থেকে কয়েকটি পরিবার বাংলাদেশে চলে এলে এ দেশেও বেনারসি শিল্পের বিকাশ ঘটে। তারা মিরপুর ও পুরান ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করেন এবং সেখানেই বেনারসি শাড়ি তৈরি করতে থাকেন। এরপরে দেশের কয়েকটি স্থানে বেনারসি শিল্প ছড়িয়ে পড়ে।
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল