স্থূলতা বা ওবেসিটি দেশের তরুণ সমাজের জন্য বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এ রোগ। স্থূলতার কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ অসংক্রামক নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। কেবল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করলেই এ সংকট নিরসন সম্ভব। পাশাপাশি স্থূলতা প্রতিরোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা।
বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাইসুল হোসেনের (৩৪) ওজন ১০০ কেজির ঘর ছুঁই ছুঁই। শরীরে বাসা বেঁধেছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগ। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিদিন সকালে হাতিরঝিলের পাশের ফুটপাতে হাঁটেন তিনি। রাইসুল বলেন, ‘ওজন বেড়ে যাওয়ায় নানা ধরনের জটিলতা শুরু হয়েছে। ডায়াবেটিস দেখা দিয়েছে, ইউরিক অ্যাসিড বেড়েছে, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছি। চিকিৎসক ওষুধের পাশাপাশি প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটতে বলেছেন। খাবারের তালিকায় পরিবর্তন এনে ওজন কমিয়ে সুস্থ থাকার চেষ্টা করছি।’
মুটিয়ে যাচ্ছেন মহানগরের বাসিন্দারা। এ সমস্যা শুধু আর শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাম-শহর সব জায়গায় শিশু, তরুণ, পৌঢ়, বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষ স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন। এটা শুধু দেশের নয়; বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশ্বে ১০০ কোটির বেশি মানুষ স্থূল বলে মনে করা হচ্ছে। স্থূলতার কারণে অনেক গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং গবেষকদের আন্তর্জাতিক গ্রুপগুলোর হালনাগাদ হিসেবে এ তথ্য জানা যায়। অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ, যেসব দেশের মানুষ অপুষ্টিতে ভুগতেন, এখন সেসব দেশসহ বেশির ভাগ দেশে কম ওজনের চেয়ে স্থূলতা সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন দ্য ল্যানসেটে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই গবেষণা প্রতিবেদনের জ্যেষ্ঠ লেখক ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের একজন অধ্যাপক মাজিদ ইজ্জতি বলেন, স্থূলতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতো। ১৯৯০ সালে বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর ও শিশুদের মধ্যে ২২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ স্থুলতার সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৩ কোটি ৮০ লাখ। তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশ স্থূলতা বৃদ্ধির উর্বর ভূমি হিসেবে বিবেচিত। তবে এখন আর এটি শুধু সেসব দেশে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিকভাবে যদিও কম ওজনের বিষয়টি সচরাচর কমই দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে অপুষ্টি ও স্থূলতার সমস্যা- যা ‘ডাবল বোঝা’ হিসেবে পরিচিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
আগামী ৪ মার্চ বিশ্ব স্থূলতা দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে গত মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশে দৈহিক স্থূলতার ব্যাপকতা : সচেতনতা, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জড়ো হন দেশের শীর্ষস্থানীয় এন্ডোক্রাইনোলজি বিশেষজ্ঞরা। সমকাল আয়োজিত এই বৈঠকে দেশে স্থূলতা পরিস্থিতি বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে মতামত তুলে ধরা হয়। বৈঠকে অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান বলেন, ‘স্থূলতার কারণে সৃষ্ট নানা জটিলতায় বছরে বিশ্বে ৪০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বজুড়েই প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার বাড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে ৮০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ স্থূলতায় আক্রান্ত। ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সি প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ অতিরিক্ত ওজনধারী এবং ১৩ শতাংশ স্থূলতায় ভুগছেন।
অধ্যাপক ডা. ফিরোজ আমিন বলেন, ‘অতিরিক্ত ওজন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ উপমহাদেশের মানুষের বডি ম্যাস ইনডেক্স (বিএমআই) সূচক যদি ২৩ অথবা তার বেশি হয়, সেটিকে অতিরিক্ত ওজন ধরা হয়। ফলাফল যদি ৩০ অথবা তার বেশি হয়, তখন সেটিকে বলা হয় স্থূলতা।’ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনকে স্থূলতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কতক্ষণ ব্যায়াম করি, হাঁটি, কী খাবার খাই- এসব নিয়ে ভাবতে হবে।’ ডা. তাহনিয়াহ্ হক বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ উচ্চ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার গ্রহণ করে বেশি। পক্ষান্তরে হাঁটাচলা করে কম। তাই স্থূলতা একটি সাধারণ রোগ হয়ে উঠেছে, যা উপেক্ষা করার মতো নয়।’ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, স্থূলতার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে ওজন বেড়ে যাওয়াসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। ফলে ডায়েবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ইউরিক অ্যাসিড, হৃদরোগ, কিডনি রোগ হচ্ছে। অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, প্রসেস ফুড খাবার প্রবণতা বাড়ছে। শিশুরাও এসব খাবারে আসক্ত হচ্ছে। নিয়মিত হাঁটা, শারীরিক কসরত বাড়ানো এবং পরিমিত পরিমাণে সুষম খাবার খেলে স্থুলতার সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।’