রাত যখন নষ্ট টাইমের ল্যাপটপে সম্ভবত পৌনে ১২টা, তখন হঠাৎ কুকুরগুলো ডেকে ওঠে। এরকম প্রায়ই ডাকে। ওরা রাতের পাহারাদার। এলাকায় চোর ডাকাত এলে, অচেনা কেউ এলে ওরা ঝাঁক বেঁধে ডেকে ওঠে। আবার নিজেদের মধ্যে যে ঝগড়াঝাঁটি হয় না, ওরকমও নয়। হয়। হয় বলেই ওরা কুকুর। আর মানুষ?
তাহলে নিভু নিভু আলোতে অন্ধকারে গলিতে অচেনা কে এলো? কুকুরগুলো এমন করে ডাকছে কেন? এখন অবশ্য তেমন ডাকের প্রকোপ নেই। তবু দুয়েকটা ডাক যে শোনা যাচ্ছে না, তা নয়। থেকে থেকে কোনোটা ঘেউউ করে ওঠে, কোনোটা কাতর আর্তনাদের মতো মৃদু চিৎকারে, আবার কাউকে ঘেউ ঘেউ রবে খেঁকিয়ে উঠতে শোনা যাচ্ছে। তাহলে রাতগুলো নীরব নয়।
এরকম এক রাতে এই কিছু দিন আগে আজমল ঘুমায়। ঘুমের ভিতর স্বপ্ন দেখে এক।
২.
আজ কুকুরগুলো ডাকছে না কেন? নদী ও পাহাড়গুলো বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষ। শহরের মানুষ বদলেছে আরও আগে। গ্রামের মানুষ শহরে এসে পড়েছে আর শহরের মানুষ পালাচ্ছে গ্রামে। অবশ্য গ্রামেও আজকাল কুকুরের উৎপাত যে বাড়েনি এমন খবর শোনা যায় না। আজমলের স্বপ্নের ভিতর একদল কুকুর ছিল। তারা কামড়িয়ে কামড়িয়ে মারছিল আজমলকে। ছিঁড়ে ফেলছিল নখর দিয়ে তার বুক। পাঁজরের হাড়গুলো কামড়ে ভেঙে ফেলছিল আর হৃৎপিণ্ডটা বের করে এনেছিল। হঠাৎ কুকুরগুলো পিছিয়ে যায়। পিছিয়ে অনেক দূরে যায়। যেন যায়। যেন আজমল হৃৎপিণ্ড নয়, বুকের ভিতর ধারণ করেছিল একটা গ্রেনেড।
আজকাল কুকুরগুলো ডাকে না। মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ হয়। আকাশ থেকে তীব্র বেগে আসে হেলিকপ্টারের শব্দ। এসব স্বাভাবিকতা নয়। শোনা যায়, রাত নাকি চুরি করে নিয়ে নেবে অন্ধকারের কোনো অপশক্তি। শোনা যায়, যুদ্ধ নাকি লেগে যেতে পারে দেশে। কিন্তু কুকুরগুলো এত নিশ্চুপ কেন? নাকি আজমলের বুকের ভিতরের হৃৎপিণ্ড দেখে তারা যে ভয় পেয়েছিল সে ভয় আজও তাড়া করছে তাদের। নাকি তাদের ডাকের আবারও সময় হয়ে ওঠেনি। নাকি অত রাত হয়নি যে তারা ডাকবে। নাকি এতই বেশি রাত যে তারাও প্রহরীপনা ছেড়ে ঘুমাতে গেছে ক্লান্ত হয়ে। এখন রাত ঘড়িতে কয়টা বাজে? আজমলের ঘড়িতে সেদিন কটা বেজেছিল। রাত হয়ে যাচ্ছিল নাকি সন্ধ্যা। হয়তো সন্ধ্যার শুরু তখন। সময়টা জিজ্ঞেস করিনি। একজন আমাকে দেখাতে চেয়েছিল। দেখার ইচ্ছে হয়নি। এত নৃশংসতা হয়তো সহ্য করতে পারতাম না। সে বলেছিল, আমি বারান্দা দিয়ে ভিডিও করলাম। কুকুরগুলো... বলেই সে হু হু করে কেঁদে উঠল। আমি তার চোখের পানির মূল্য দিতে যাইনি। এ জগতে কে-ই কার চোখের পানির মূল্য দিতে জানে? বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সেদিন তাণ্ডবটা শুরু হয়-সে বলেছিল।
আমি বললাম, ওসব থাক না। এখন আর বলে লাভ কী? ভালোবাসার মধ্যে যদি খাদ থাকে, তবে তা এক দিন আসলকেই গ্রাস করে ফেলে তা আর জানার অজানা কী? ...অভিমান করার সময় এখন না- সে বলেছিল, বাঙালি জাতি অনুতপ্ত হতে সময় নেয় না। এখন সব কিছু দেখছে জানছে। জেগে উঠতে বেশি দিন লাগবে না। এখনো হতবাক অবস্থা কাটেনি। এক-দুজন যে প্রকাশ্যে নির্যাতনের মুখে সত্যটা উচ্চারণ করছে না তা তো নয়, আওয়াজ উঠছে। এক-দুই-চার করেই বিশ্ব। আমি তারপরও ভিডিওটা দেখতে রাজি হইনি।
৩.
আজ যখন কুকুরগুলো এখনো ডেকে উঠছে না কেন এ নিয়ে ভাবছি, তখন একটা কুকুর কুইওইই করে উঠল। যেন সে বোঝাতে চায়- আমি না, আমরা পশুরা না। আজমলের হৎপিণ্ডটা খুলে বের করতে চেয়েছিল তোমাদের মতো মানুষ। হ্যাঁ একদল মানুষ।
আবার শূন্যতার ভিতর মিলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। সবকিছু কেমন অসার, নিষ্প্রাণ এবং ঘ্রাণশূন্য। এই কিছুদিন আগে ডাকাতি চলছিল। গণডাকাতি। আর এখন ত্রাসের সঙ্গে পেরে উঠছে না প্রশাসন। জনগণও যেন জিম্মি হয়ে আছে। এই রাতটা, এই লাখো কোটি তারা, এই আসমান, এই মানচিত্রের মাটি-মাতৃভূমি-মানুষ- সব সব সব...।
এভাবে বন্দি হতে থাকলে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা না থাকলে... সে সেদিন বলেছিল, না থাকলে মূল্যবোধ আর দেশপ্রেম, তাহলে আজমলের হৃৎপিণ্ড তো গ্রেনেড হতে বাধ্য হবেই। সে সে দিন বলেছিল, দেখছিলাম কুকুরগুলো কীভাবে তাড়া করে তাকে নিয়ে এসেছিল খাস খানকায় যাওয়ার গলিটার দিক থেকে। সে বলছিল, যেন কুকুরগুলো যুদ্ধ করছিল একটি সভ্যতার বিরুদ্ধে। সে আরও বলছিল, কুকুরগুলো তর্জন-গর্জন করছিল এতই, আশপাশের দোকান খোলার তো প্রশ্নই আসে না, আবাসিক ভবনগুলোর দরজাও ছিল লাগানো। জানালাও সিটকিনি আঁটা, পর্দা টানানো। সব ঘরে লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আরও শক্ত কিছুর আড়াল খুঁজছে অধিবাসীরা, কেউ কেউ মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। গুলি লাগার ভয়ে। ...স্নাইপার তাক করা ছিল, অধিকাংশ ভবনে না, তবে বেশ কিছু নিশ্চয়। তিনটা বাচ্চা মারা গেল কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে দৌড়ে বারান্দায় বা জানালায় চলে গেছে বলে। ...আমি মরিনি। জানের বাজি রেখে অবশ্য ভিডিওটা করেছি। আমার একটা সুবিধে ছিল, আমার বারান্দা লাগোয়া ডানপাশের ভবনটি আমার চাচার, আর সামনের ভবনের লোকজন-ডাবল তালা লাগিয়ে সকালেই পালিয়েছে প্রাণ নিয়ে। গেটের তালাগুলো কেউ ভাঙার চেষ্টা করেছে বোধ হয়, পারেনি নিশ্চিত ছিলাম। আর আমার বাঁ-পাশে সিঁড়িপথের প্যাঁচানো বাড়িয়ে রাখা গার্ড। মোটামুটি চারদিক থেকেই কাভার পাচ্ছিলাম। তখনো আকাশে হেলিকপ্টার উড়ছিল। কিন্তু গুলি করেনি আমাদের এদিকে। ওদের কাছে শক্তিশালী টেলিস্কোপ আছে নিশ্চয়। না হলে এমন ঘাপটি মেরে বসে থেকে ভিডিও করছি অনন্তকাল ধরে...হ্যাঁ, অনন্তকালই তো। দুই মিনিট কি চার মিনিটের ভিডিও বোধ হয়। কিন্তু সেখানে সত্যি আমার দুই যুগের সঙ্গে আরও এক যুগের জীবনে এমন স্থবির সময় পাইনি। যেন পাথরের একেকটা পর্বতমালা একেকটা ন্যানো সেকেন্ড। কুকুরগুলো তাড়া করে আনলো আজমলকে।
৪.
দ্য লর্ড ব্রোমাজিপাম আর টাকা দিয়ে কিনে ডিও নেশার শেষ রাতটাকে চার ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আজলায় তুলে ফেলে দেয়। রাতটা আর তিন ভাগ থাকে। কেউ একজন রাতটা থেকে চুরি করে উদ্বাস্তু কুকুরগুলোকে, রাতটা আরেক ভাগ কমে। তারপর আজমলের মৃত্যুর জন্য কমে আরও এক ভাগ। শেষ ভাগটা সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠলে দেখি, আমি নিজেই কুকুর হয়ে গেছি, একটা নয়, দুটো নয়, পৃথিবীর সব এক হয়ে প্রভাবিত করেছে আমাকে। আমি রাতের পরে রাত ভাঙছি। সাঁতরে পার হচ্ছি অন্ধকার। আর অন্ধকারের ভিতর সারি সারি দাঁড়িয়ে যেতে দেখছি আজমলদের। তারাও রাত ভাঙবে শপথ নিয়েছে। শপথের পক্ষে শহীদ হয়েছে। আর আমি ভুলে গেছি সেটি সত্যি সত্যিই একাধিক রাতের সমান একটি রাত ছিল কি না, যখন আজমলকে তুলে আনা হলো মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে, অথবা আধমরা করে। অথবা শুধু লাশটিই নিয়ে আসা হয়েছে উল্লাস করার জন্য...আমি জানি না। আর জানি না সত্যিই এর মধ্যে এতগুলো রাত পার হয়ে গেছে কি না, কারণ আজমলদের মতো এ রকম ভূমিপুত্রকে প্রতিদিনই খুবলে খাচ্ছে কুকুরগুলো, কুকুরগুলো তীব্রভাবে চিৎকার করে বলছে, না না মানুষ।