আকাশ-পাতাল তোলপাড় করা হৈ-হুল্লোড়ে ঘুম চটকে গেল। লাফ দিয়ে বাইরে এসে দেখি তুলকালাম কাণ্ড। তখনো সকাল হয়নি। ভোর।
এরপর শুরু করি গত রাত থেকে। কালাবনের দোচালায় দুটি কামরা। একটায় থাকি আমি, শ্রমিকরা অন্যটায়।
বাইরে ঘুটঘুটে আঁধার। দোচালার চারপাশে চারটা হারিকেন ঝুলছে। ক্ষীণ আলোয় দোচালার আঙিনায় রহস্যময় আবহ। দুজন সশস্ত্র প্রহরী দরজার সামনে বসে আছে, তাও শঙ্কা কাটছে না। কালাবনের বোবা ভাষাটাও রপ্ত হয়নি এখনো, কেমন দুর্ভেদ্য ঠেকছে। অন্যান্য জঙ্গলের ভাষা কিছুটা বুঝতে পারি। প্রত্যেক জঙ্গলেরই একটা নিজস্ব ভাষা আছে, যে ভাষা হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। নিবিড়ভাবে কান পাতলে সে ভাষা হৃদয়ঙ্গম করা যায়।
বনভূমি তখন নিস্তব্ধ। কোনো জন্তু-জানোয়ারের হাঁকডাক নেই। নেই রাতচরা পোকামাকড়ের চেঁচানিও। মাঝেমধ্যে হরিণের ডাক ভেসে আসে দূর থেকে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আকাশ পরিষ্কার এখন। তারারা মিটমিট জ্বলছে। রাতের প্রথমার্ধ্ব পর্যন্ত চাঁদের আলো থাকলেও এ মুহূর্তে ঘোর আঁধার; যেন অমাবস্যা। আকাশ পরিষ্কার থাকায় লক্ষ তারা নজরে পড়ছে। লক্ষ কোটি যোজন দূরে হলেও নক্ষত্রমণ্ডলীকে পাড়াপড়শি মনে হয়। মনে হচ্ছে কত চেনা। আবার যেন দেখতে পাচ্ছি প্রিয়জনদের প্রতিচ্ছবিও, যারা আমাদের ছেড়ে তারার দেশে গিয়ে ঘুমাচ্ছে।
যখন এমন কত কী ভাবছি, তখনই জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম দোচালা ছাড়িয়ে ২৫-৩০ গজ দূরে বনের ভিতরে ক্ষীণ আলোর ঝলকানি। বিস্মিত হলাম। দরজার কাছে দাঁড়াতেই ধারণাটা পরিষ্কার হলো। প্রহরী দুজন দরজার সামনেই বসে আছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল ওরা। বললাম, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কী কোনো কাজে জঙ্গলে ঢুকেছে?’
ওরা ‘না’ সূচক জবাব দিতে আমি চিন্তিত হলাম। কারণ নিজ চোখেই দেখেছি আলোকরশ্মির ঝিলিক। যদিও তত উজ্জ্বল নয় সেই আলোকচ্ছটা। বিষয়টা খুলে বললাম ওদের।
শুনে কায়েছ আলী বলল, ‘বড়মিয়া, ডাকাত সন্দেহ হয় আমার। সবাইকে জাগিয়ে দিই।’
কালাবনের ভেষজ প্লান্টের লোকজন আমাকে ‘বড়মিয়া’ সম্বোধন করে। আমার নাম রাজ্জাক বিশ্বাস। প্লান্টের পরিচালক আমি। ঢাকার অফিস থেকে তাগিদ দিচ্ছে দ্রুত ভেষজ মালামালগুলো শিপমেন্ট করতে। সেই লক্ষ্যে আমরা রাতদিন কাজ করছি।
কালাবনের ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা ইউরোপে ব্যাপক। তাই রোমানিয়ার এক প্রতিষ্ঠান নিঝুম দ্বীপের কালাবনে ভেষজ প্লান্ট গড়েছে বনভূমি লিজ নিয়ে। এই প্লান্টটাই দেখাশোনা করতে হচ্ছে আমাকে।
বড়মিয়া সম্বোধনে ওরা শান্তি পায়। কায়েছ আলীর মুখে ডাকটা শুনে বিরক্তবোধ করলাম। বললাম, ‘কথায় কথায় বড়মিয়া ডাকতে হবে না; স্যার বলবে। আর শোন ওরা ডাকাত নয়, আমি নিশ্চিত। অন্য কিছু হবে হয়তো। বের করার চেষ্টা কর।’
কায়েছ আলী বলল, ‘বড়মিয়া, সরি স্যার, যেই হোক না কেন, গুলি ছুড়ে দিই, অর্ডার করেন।’
‘এখন না। সময় হলে বলব। বিষয়টা আগে নিশ্চিত হতে হবে।’
এই গহিন জঙ্গলে গভীর রাতে কারা এসেছে, কেনই বা এসেছে যোগ-বিয়োগ করে কূলকিনারা করতে পারছি না। আমি যখন হিসেব-নিকেশে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আবার নজরে পড়ল আলোর ঝলকানি। এবার অত কাছাকাছি নয়; স্পষ্টও নয়; ক্ষীণ। প্রহরীদের আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বললাম, ‘দেখ দেখ, ওই যে আলোর ঝিলিকটা।’
ওরা দুজন সেদিকে তাকাল, উঁকিঝুঁকি দিল, কিছুই দেখল না। এবার আমি একটু অপ্রস্তুত হলাম। কী ভাবছে ওরা আমাকে। দুই-তিন মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম, আবার যদি নজরে পড়ে। এরই মধ্যে শুনতে পেলাম, ‘দ্রিম... দ্রিম...’ আওয়াজ। প্রহরীদের উদ্দেশে বললাম, ‘তোমরা শুনতে পেয়েছ আওয়াজটা?’
প্রহরীরা বন্দুক উঁচিয়ে পজিশন নিল। কায়েছ আলী বলল, ‘ডাকাত! গুলি ছুড়েছে, আমরাও ফাঁকা আওয়াজ করি।’
বললাম, নিঝুম দ্বীপের কোথাও ডাকাত-টাকাত নেই। ওরা চোরাশিকারি। হরিণ শিকার করতে এসেছে। তোমরা দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়। দেখবে ওরা পালাবে।’
মুহূর্তেই প্রহরীদের দুই বন্দুক গর্জে উঠল। তারপর সব চুপচাপ। আমি নিশ্চিত হলাম ওরা আসলেই চোরাশিকারি।
ঘটনার ঘণ্টাখানেক পরে দোচালায় ঢুকে চাটাইয়ের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। নানান কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত পেরিয়ে গেছে টেরই পাইনি। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিল।
এমন সময় শ্রমিকদের সেই হট্টগোল। শুনে লাফিয়ে বাইরে এলাম। কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পারলাম। না হলে সাতসকালে অমন হৈ-হল্লার কথা নয়।
দোচালা থেকে বেরিয়ে আঙিনায় দাঁড়াতেই দেখতে পেলাম রক্তাক্ত কাণ্ড! প্লান্টের শ্রমিক তমিজ ছৈয়াল, মাটিতে পড়ে আছে। আমি হতবিহ্বল।
প্রহরী মহব্বত দয়াল আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সব কিছু বুঝিয়ে বলতে।
সে জানাল, ‘তমিজ ছৈয়াল পুকুর পার থেকে মহিষের একটা বাছুর ধরেছিল। বাছুরটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে আনার সময় মা-মহিষ বাছুরটাকে উদ্ধার করতে দৌড়ে এসে ওর পেটে শিং ঢুকিয়েছে।’
‘কী সর্বনাশ! এখন কেমন আছে?’
‘না, ভালো না। খুব খারাপ অবস্থা, বাঁচবে কিনা সন্দেহ।’
এগিয়ে গেলাম তমিজ ছৈয়ালের কাছে। দেখলাম শিংয়ের গুঁতায় ওর পেট এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে। ওর শরীর স্পর্শ করলাম, বেঁচে আছে কিনা নিশ্চিত হতে। দেখলাম শ্বাসপ্রশ্বাস বইছে ঠিকই, তবে আশঙ্কাজনক অবস্থা, তাতে সন্দেহ নেই। দ্রুত ওর চিকিৎসা প্রয়োজন। সবাইকে আশ্বস্ত করে বললাম, ‘কালাবনে আজ আর তোমাদের কাজ করতে হবে না। তোমরা এখনই তমিজকে কাঁধে তুলে শালতলার বাংলোর দিকে রওনা দাও। আমি তোমাদের সঙ্গেই যাচ্ছি। দ্রুত চল। পালা করে কাঁধে নেবে, ওকে যে করেই হোক বাঁচাতে হবে।’ গামছা পেঁচিয়ে তমিজের ক্ষতস্থান বেঁধে, দ্রুতই যাত্রা শুরু করলাম আমরা।
আমাদের এই দলে তমিজের ছোটভাইও আছে; সেও এ প্লান্টেরই শ্রমিক। ওর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। তমিজের বয়স ওর থেকে দুই-এক বছরের বেশি। ওদের বাড়ি নিঝুম দ্বীপের কোনো এক গ্রামে।
জঙ্গল মাড়িয়ে ছুটছি শালতলার উদ্দেশে। পথের যেন শেষ নেই। যেখানে জঙ্গল ভেঙে একা হাঁটাই দায়, সেখানে একজন মানুষকে কাঁধে নিয়ে হাঁটা কী যে কষ্টকর, তা বোঝানো মুশকিল। এভাবে বহু কষ্টে হেঁটে বন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে তমিজ ছৈয়ালকে নিয়ে আমরা শালতলায় পৌঁছলাম।
সেখানে সহকর্মী বিনয় ভৌমিকের খোঁজ নিলাম আগে। সে বাংলোতেই ছিল। দ্রুত নিচে নেমে এলো।
তাকে সংক্ষেপে বিস্তারিত জানাল মহব্বত দয়াল। বললাম, ‘বিনয়, ট্রলারে কতদূর যাওয়া যাবে?’
‘নদী ধরে বেশি দূর যাওয়া যাবে না, খাল পেরুতে হবে। খাল পেরিয়ে মেঘলার বাংলোয় যেতে পারবেন না; জোয়ার-ভাটার ব্যাপার আছে। মাঝপথে আটকা পড়লে আবার ঘুরে আসতে হবে এখানেই।’
‘তাহলে তো হাতির পিঠে চড়েই যেতে হবে।’
‘এ ছাড়া আর উপায়ও নেই।’
‘ঘণ্টা চারেকের পথ পেরুতে তমিজ বাঁচবে তো?’
‘সন্দেহ! তার পরেও চেষ্টা করে দেখি।’
তমিজের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। দ্রুত হাতির পিঠে উঠালাম ওকে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘলার উদ্দেশে রওনা দিলাম। হাতি দ্রুত হাঁটতে পারছে না। পথ সুবিধার নয়, দেখেশুনে হাঁটছে হাতি। চলতি পথে তমিজ ছৈয়ালের চোখ বার বার বন্ধ হয়ে আসছে। অধিক রক্তক্ষরণ, তার ওপর ৩-৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও কোনো চিকিৎসাই শুরু হয়নি এখনো। বিষয়টা পীড়াদায়কই বটে। খুব হতাশ হয়ে গেলাম। কীভাবে দ্রুত সদরে নেওয়া যায় সেই পরিকল্পনা আঁটতে লাগলাম। মেঘলার বাংলোয় পৌঁছতে পারলে স্পিডবোটে হাতিয়া উপজেলা হাসপাতালে নিতে পারব, সেরকম ভরসা আমার। কিন্তু মেঘলা পর্যন্ত পৌঁছানোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাতির পিঠে চড়ে রওনা দেওয়ার পর ঘণ্টাখানেক পার হয়েছে। এখনো তিন ঘণ্টা বাকি। তমিজের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এদিক-সেদিক তাকাতে চেষ্টা করছে। কিছু যেন বলতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। লক্ষ্য করলাম তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত বইছে, চোখও বন্ধ হয়ে আসছে, শরীর কাঁপছে। লক্ষণগুলো ভালো ঠেকল না।
তমিজ ছৈয়ালকে মহব্বত দয়াল ঝাঁপটে ধরে বসেছে। ওর যেন কষ্ট না হয় সেই চেষ্টাই করছে। অন্য কোনোভাবে বসানোর সুযোগ নেই, সুযোগ নেই শুইয়ে দেওয়ারও। মাহুতের পেছনে তারা দুজন; আমি একদম পেছনে। যাতে ওর শরীরে ঝাঁকুনিটা কম লাগে। তারপরও হাতির হাঁটার ঝাঁকুনিতে তমিজের কষ্ট হচ্ছে টের পেলাম। ওর শরীর থেকে এখন আর রক্ত ঝরছে না। তার মানে শরীরে রক্ত আর তেমন অবশিষ্ট নেই।
তবুও আমি আশাবাদী, ওকে চিকিৎসা করিয়ে সারিয়ে তুলব। প্লান্টের পরিচালক হিসেবে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রাণান্ত চেষ্টায়ও যদি তমিজ বেঁচে যায়, এটি হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। কিন্তু সে সুযোগ পেলাম না। খানিকক্ষণের মধ্যেই মহব্বত দয়াল নিচুস্বরে বলল, ‘তমিজ আর নাই!’
কষ্টে বুক ভেঙে গেল। আহারে! কী প্রাণবন্ত উচ্ছল যুবক ছিল তমিজ। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন আমারই। কিন্তু দৃশ্যের অন্য এক টুকরো চিত্রও আছে। আর তা হলো- সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল এক তেজী মা-মহিষের অগ্নিমূর্তি। যে তার সন্তানকে উদ্ধার করতে দুই শিং উঁচিয়ে তেড়ে আজছে একজন মানুষের দিকে, যার হাতে বাঁধা পড়েছে তার বুকের মানিক, শিশু শাবক...