কারও যদি এক টুকরো জমি থাকে, সে জমির যত্ন করতে হয়। যত্ন না করলে ফসলের রত্ন মেলে না। আমাদের সবার বুকের ভিতরও এক ফালি জমি রয়েছে। হাদিসের ভাষায় সে জমির নাম কলব। যার জমি যত যত্ন পেয়েছে, তার জমি তত বেশি ফলে-ফুলে ভরে উঠেছে। আর যে কলব জমির যত্ন নেয়নি, গুনাহর আগাছায় তার কলব ছেয়ে গেছে। আশার কথা হলো, অন্ধকার কলবে আলো ফোটাতে এসেছে রমজান। একে একে তিনটি রোজা পার করে আজ আমরা চতুর্থ রমজান যাপন করছি। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার বর্জনের মাধ্যমে রোজা পালন করা হয়। দীর্ঘ অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা কলব পরিষ্কার করতে শুধু সকাল-সন্ধ্যা না খেয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তারাবি-তাহাজ্জুদের মত ঘাম ঝরানো সাধনা। তাই রোজা রেখে তারাবির আদায়ে অত্যন্ত যত্নশীল হওয়া প্রয়েজন।
জামায়াতের সঙ্গে তারাবির নামাজের বর্তমান নিয়মটি চালু হয়েছে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুকের (রা.) সময় থেকে। এর আগে অর্থাৎ রাসূলে পাক (সা.) ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকের (রা.) সময়ে এমনকি হজরত ওমর ফারুকের খেলাফতকালের প্রথম ভাগেও মুসলমানরা রমজানের রাতগুলোতে এশার নামাজের পর একাকী তারাবির নামাজ পড়তেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা.) রমজানের রাতগুলোতে ইবাদতের জন্য আমাদের উৎসাহ দিতেন। কিন্তু জোরালো আদেশ দিতেন না। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি রমজানে ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে কিয়াম করবে, তার পূর্বের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। এভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাতের ইবাদত করার নিয়ম চালু ছিল তার জীবদ্দশায়। হজরত আবু বকর সিদ্দিকের সময়ে একই নিয়ম চালু ছিল। এটিই বহাল ছিল হজরত ওমর ফারুকের (রা.) খেলাফতকালের প্রথম ভাগেও।’ (বুখারি শরিফ)
হজরত ওমর ফারুকের সময়ে জামাতের সঙ্গে তারাবি চালু হওয়া প্রসঙ্গে একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন আবদুর রহমান ইবনে সায়েব ইবনে আবদুল কারি নামে এক তাবেয়ি। তিনি বলেন, রমজানের এক রাতে হজরত ওমর ফারুকের সঙ্গে আমি মসজিদে নববিতে গেলাম। দেখলাম লোকেরা বিক্ষিপ্তভাবে ইবাদত করছে। কেউ একাকী, আবার কারো সঙ্গে কয়েকজন যোগ দিয়ে নফল নামাজ আদায় করছেন। হজরত ওমর বললেন, এদের সবাইকে একজন তিলাওয়াতকারীর পেছনে একত্র করে দিলে ভালো হতো। পরে হজরত উবাই ইবনে কাবকে ইমাম করে সবাইকে এক জামাতে নামাজের ব্যবস্থা করেন। এরপর অন্য এক রাতে বের হয়ে হজরত ওমর দেখলেন সবাই একত্রে তারাবির নামাজ পড়ছে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বললেন, চমৎকার বেদাত এটি। (বুখারি শরিফ।)
সালাতুত তারাবিহ জামায়াতের সঙ্গে আদায়ের আয়োজন থাকায় অনেক মানুষ একই সঙ্গে কুরআন শরিফ শুনে শুনে দীর্ঘ সময় ধরে নফল নামাজ আদায় করতে পারেন। তাছাড়া জামাতের সঙ্গে আদায়ের কারণে রোজাদার মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঐক্য ও সম্প্রীতির দৃঢ় বন্ধন। এ জন্য হজরত ওমরের (রা.) সময় থেকে এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে রমজানুল মুবারকে সিয়াম সাধনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তারাবি জামাত। শহর এলাকার বেশির ভাগ মসজিদে খতম তারাবি হয়ে থাকে। ফলে যারা নিয়মিত তারাবি নামাজে অংশ নেন, তাদের পক্ষে পুরো কুরআন মাজিদ একবার শোনার সুযোগ হয়। বিশেষ কোনো অসুবিধা না থাকলে রমজান মাসে সিয়াম পালনের পাশাপাশি সালাতুত তারাবিহে নিয়মিত যোগদানে সচেষ্ট থাকা উচিত।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর
www.selimazadi.com