ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধসহ চার দফা দাবি কেন্দ্র করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ ঘটে। এতে শিক্ষার্থী, বহিরাগতসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য ক্যাম্পাসে উপস্থিত রয়েছেন। এ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে বাহিনীটির তরফে জানানো হয়েছে। এদিকে, কুয়েটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আর কুয়েটে সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাবিতে গত রাতে পাল্টা সমাবেশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। অন্যদিকে, হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ পাঁচ দাবি পূরণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আজ বেলা ১টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন কুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে দাবিপূরণ না হলে সকল প্রকার ক্লাস, পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। গত রাতে ক্যাম্পাসে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
আর কুয়েটে হামলার প্রতিবাদে ঢাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, কুয়েটে যে নারকীয় হামলা হয়েছে তার প্রতিবাদে আগামীকাল (আজ) দেশের সব ক্যাম্পাসে জুলাইয়ের ও কুয়েটে নারকীয় নির্যাতন-নিপীড়নের ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হবে। ঢাবি টিএসসিতে আজ বিকাল ৩টায় এ প্রদর্শনী শুরু হবে। কুয়েটের সংঘর্ষ নিয়ে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর তুলে ধরা হলো-
খুলনা : কুয়েটের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানালে ছাত্রদল তাদের ওপর হামলা চালায়। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাম ব্যবহার করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি অংশ ও ছাত্রশিবির ন্যক্কারজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে বলে দাবি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের।
জানা যায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ আছে। তবে ছাত্রদলের কর্মীরা ক্যাম্পাসে সংগঠনের সদস্য ফরম ও লিফলেট বিতরণ করলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ও এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। এ নিয়ে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর বেলা ২টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধসহ চার দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিকাল ৫টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে আলটিমেটাম দেন। এ সময় ছাত্রদের একটি অংশ ‘ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা, এ কুয়েটে হবে না’, ‘দাবি মোদের একটাই, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে হলগুলো প্রদক্ষিণ করেন। ছাত্রদলের কর্মীরা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে দুই পক্ষে উত্তেজনা দেখা দেয়।
পরে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ছাত্রদের একটি গ্রুপের হয়ে বহিরাগতরা ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা নিয়ে কুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়। ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে ৩০-৩৫ জন আহত হন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশের একাধিক টিম গিয়ে ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : কুয়েটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর ছাত্রদলের হামলার অভিযোগের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। গতকাল রাত সাড়ে ৭টার দিকে আরিফ সোহেলের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক অংশ বিক্ষোভ সমাবেশ করে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে। একই সময় একটি মশাল মিছিল নিয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সমাবেশ শেষে পৌনে ৮টার দিকে তারা চলে যাওয়ার পর পুনরায় রাত সোয়া ৮টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেকটি অংশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলেন, কুয়েটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের ন্যক্কারজনক হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করছি। একদল ক্ষমতায় থাকতে হামলা করত, আরেকদল ক্ষমতায় আসার আগেই হামলা করছে। ছাত্রদল কুয়েটে যা করেছে তা নব্য ফ্যাসিবাদ। ছাত্রদল যদি ক্যাম্পাসে হামলা করে তাহলে তাদের অবস্থা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মতো হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এ বাংলাদেশে আবার যারা ছাত্রলীগ (এখন নিষিদ্ধ) হতে চাইবে, যারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চাইবে তাদের অবস্থা ছাত্রলীগের মতোই হবে। আমরা গুম, খুন, চাঁদাবাজির রাজনীতি ফিরে আসতে দেব না। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসীদের ঠিকানা হবে না। ছাত্রদলের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা শিক্ষার্থীদের ভাষায় কথা বলুন। আপনারা শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনীতি করতে চাইলে তাদের মতো করে কথা বলতে হবে। কিন্তু আপনারা যদি চাঁদাবাজি করতে চান, টুঁটি চেপে ধরার, হামলার রাজনীতি করতে চান তাহলে আপনাদের পরিণতি হবে ছাত্রলীগের মতো। আপনারা মজলুম ছিলেন, জালিম হইয়েন না। যদি মজলুম জালিম হয়ে যায় তাহলে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, আমরা আগে দেখেছি সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজুতে কর্মসূচি দিলে ছাত্রলীগ কর্মসূচি দিত মধুর ক্যান্টিনে। আজকেও আমরা দেখছি শিক্ষার্থীরা রাজুতে কর্মসূচি দেওয়ায় একই সময় এখানে কর্মসূচি দিয়েছে কুয়েটে হামলা করা সেই ছাত্রদল।
এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কুয়েটে ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় বুয়েটের শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
ইবি : কুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বিক্ষোভ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাত ৯টায় ক্যাম্পাসের জিয়া মোড় থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলে ইবির সমন্বয়ক এস এম সুইটসহ অন্য সহসমন্বয়ক ও বিভিন্ন বিভাগের কয়েকশ শিক্ষার্থী অংশ নেন। মিছিল পরবর্তী সমাবেশে শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
রাবি : কুয়েটে হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা চত্বর থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, কুয়েটে যে হামলা চালানো হয়েছে আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি।