আজ ১৫ জানুয়ারি প্রখ্যাত রাজনীতিক মহিউদ্দীন আহমদের জন্মদিন। উচ্চ আদর্শ, নীতিনিষ্ঠা আর সত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপসহীনতার জন্য মৃত্যুর ২৭ বছর পর আজও তাঁকে মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কারণ তিনি ছিলেন বাঙালির কাছে অনুসরণীয় মহান রাজনীতিক। ১৯২৫ সালে বরিশাল জেলার তৎকালীন মহকুমা শহর পিরোজপুরে তাঁর জন্ম।
১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনে মহিউদ্দীন আহমদের সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর বাবা আজহার উদ্দীন আহমদও ছিলেন রাজনীতিক। কিংবদন্তি আছে, আজহার উদ্দীন তিনবার হজ করার জন্য হেঁটে মক্কা পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সংস্কৃতিমান ও উচ্চশিক্ষিত হিসেবে তাঁর নামডাক ছিল। আজহার উদ্দীন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন হাজী শরীয়তউল্লাহ ও তাঁর ছেলে দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে।
পাঁচ বছর বয়সে মহিউদ্দীন আহমদ গণমিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। প্রবীণ বয়সে সেই স্মৃতিচারণা করে তিনি আমোদ অনুভব করতেন। ১৯৩৬ সালে নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে মহিউদ্দীন আহমদের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১১ বছর। তিনি লেখাপড়া করেন কলকাতায়। সে সময় তাঁর ইঞ্জিনিয়ার ভাইয়ের বাসায় পার্ক সার্কাসে থাকতেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই তিনি ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তখনকার প্রধান প্রধান রাজনীতিকদের তিনি প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন।
মহিউদ্দীন আহমদ ১৫ বছর বয়সে লাহোরে মুসলিম লীগ সম্মেলনে যোগ দেন। এ সম্মেলনেই পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়। তাঁকে বলা হতো ‘আপাদমস্তক গণমুখী নেতা’। তিনি বিত্ত সংগ্রহ বা নিজের স্বার্থ সম্পর্কে ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। রাজনীতি ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ১৯৪২ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ভুখা মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খোলা, মজুতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থান নেওয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন আকর্ষণীয় তরুণ নেতা।
১৯৪৩ সালে তিনি সর্বভারতীয় ছাত্রনেতার মর্যাদায় উন্নীত হলেও স্বজেলা বরিশালকে অন্তর থেকে আলগা করেননি। নানা জায়গায় সফরে ব্যস্ত থাকলেও বরিশালের ভালোমন্দের খবর সব সময় রাখতেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বরিশাল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসক গোষ্ঠীর গণবিরোধী আচরণের বিরুদ্ধে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রগতিশীল অন্য রাজনীতিকদের সঙ্গে একাত্ম হন। লক্ষ্য ছিল বাঙালির অধিকার আদায়। এ পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অনশন পর্যন্ত করেছেন। তাঁর এ অনশনের প্রতিক্রিয়ায় সমগ্র বরিশাল, ঢাকায় সমাবেশ-মিছিল এমন পর্যায়ে গিয়েছিল- সরকার তটস্থ হয়ে পড়েছিল। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ১৯৫৬ সালে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে সফলভাবে মহিউদ্দীন আহমদ বিল উত্থাপনের মাধ্যমে বিশেষ কীর্তি স্থাপন করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি রক্ষার জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী আন্দোলনের একজন বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে দক্ষতার প্রমাণ দেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই তিনি সংগ্রামী রাজনীতিক। এ জন্য অনেক বছর তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তবু তিনি আপস করেননি। আমৃত্যু জনগণের পাশে ছিলেন। এ সংগ্রামে তাঁর কোনো বিরাম ছিল না।
প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মহিউদ্দীন আহমদ ব্রিটিশ আমল থেকে বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। এ মহান নেতা কারাপ্রাচীরের অন্তরালে জীবনের বহু বছর কাটিয়েছেন এবং আমৃত্যু জনগণের কাজেই নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। বাংলা এবং বাঙালির জীবনই ছিল তাঁর গৌরবের বিষয়। সমগ্র জীবনই তিনি জনগণের কাজে ব্যয় করেছেন- এ কাজে কোনো বিরাম ছিল না। তিনি বিশ্বের বহু দেশে সাংগঠনিক সফরে গেছেন। ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, মিসর, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইয়েমেন, চেকোস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, সুইডেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা- সর্বত্রই তিনি বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের পক্ষে জনমত গঠন করেছেন।