স্বামীর দিনমজুরির আয়ে চলে না সংসার। অর্ধাহার-অনাহার তাদের নিত্যসঙ্গী। এমন দুর্দশায় স্বামীকে সহযোগিতা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল মনিরা আক্তারের (২৭)। এজন্য তিনি বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধান করেছিলেন। পাশের গ্রামের একটি কারখানায় কাজও জুটিয়েছিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় দুই শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তান। তারা নিজের হাতে খেতে পারে না, চলাফেরা করতেও পারে না। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার একমাত্র ভরসা মা মনিরা।
এজন্য তিনি ভাবতে শুরু করেন, বাড়িতে বসেই কীভাবে উপার্জনের ব্যবস্থা করা যায়। তাতে সন্তানদের দেখভাল করেও সংসারের আয় বাড়ানো যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন চেষ্টার পরও স্বপ্নপূরণ হয়নি। অবশেষে বসুন্ধরা গ্রুপের শুভসংঘের উদ্যোগে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে তিনি পেলেন একটি সেলাই মেশিন।
রবিবার (১৬ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে জেলা সদরের খোকসাবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব খোকসাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মনিরাসহ ২০ দুস্থ নারীকে সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়। তাদের প্রত্যাশা, এই মেশিন চালিয়ে আয়-রোজগার করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন।
মনিরা জানান, প্রায় এক যুগ আগে খোকসাবাড়ি গ্রামের মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এরপর ঘরে আসে বেবী আক্তার (১০) ও বাবু মোজাহিদ। জন্ম থেকেই তারা শারীরিক প্রতিবন্ধী।
তিনি বলেন, "আমার দুই সন্তান কথা বলতে পারে না, নিজের হাতে খেতেও পারে না। এজন্য সারাক্ষণ তাদের তদারকিতে থাকতে হয়। কিন্তু সংসারে টানাপোড়েন লেগেই থাকে। স্বামীর কৃষিকাজের আয়ে ছয়জনের সংসার চলে না। তাই আমার মন চাইতো কিছু একটা করার। কিন্তু সন্তানদের রেখে বাইরে কাজ করা সম্ভব ছিল না। এখন বসুন্ধরার দেওয়া মেশিনে বাড়িতে বসেই সেলাই কাজ করে সংসারের সহযোগিতা করতে পারবো।"
একই অনুষ্ঠানে সেলাই মেশিন পেয়েছেন খলিশাপচা গ্রামের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী আঁখি আক্তার (১৯)। তার বাবা অলিয়ার রহমান দিনমজুরি করেন। সাত সদস্যের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। সংসারের টানাপোড়েনে এসএসসি পরীক্ষার আগেই তার পরিবার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আঁখি রাজি না হয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চেয়েছেন। তবে পরিবারের অর্থাভাবে তার শিক্ষাজীবন প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে ছিল।
আঁখি জানান, "টিউশনি করার চেষ্টা করেও সফল হইনি। কিন্তু আমার স্বপ্ন ছিল বাড়িতে বসে সেলাইয়ের কাজ করে পড়ালেখার খরচ চালাবো। দিনমজুর বাবার পক্ষে সেলাই মেশিন কেনা সম্ভব ছিল না। বসুন্ধরা গ্রুপ আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে। এখন আমি বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করে নিজের ও ভাই-বোনদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারবো। পাশাপাশি বাবাকেও সহযোগিতা করতে পারবো।"
অনুষ্ঠানে সেলাই মেশিন পাওয়া অন্য নারীরাও একই অনুভূতি প্রকাশ করেন। সবার আশা, সেলাই কাজের আয় দিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উচ্ছ্বাস রায়। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা দেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য মো. মনিরুজ্জামান মন্টু। পূর্ব খোকসাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আরও বক্তৃতা দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, বসুন্ধরা ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. মামুন, কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি ভুবন রায় নিখিল, শুভসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইয়াছির আরাফাত রাফি, সদস্য ফরিদ মিয়া, আমিনুর রহমান, মো. গোলাম হোসেন, বসুন্ধরা শুভসংঘের জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপু রায় প্রমুখ।
বিডি প্রতিদিন/আশিক