আধুনিকায়নের বিশ্ব অনেক শিশুকেই অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত স্কুলে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। পৌষের এক কুয়াশাঘেরা সকালে আমি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বিচ্ছিন্ন জনপদ চর ইমারশনের একটি স্কুলে গিয়েছিলাম। এখানকার কোমলমতি শিশুরা সেই অত্যাধুনিক সুবিধা পাওয়া সৌভাগ্যবানদের দলভুক্ত নয়। যেখানে স্বপ্ন সত্যি হয়আগুনমুখা নদীর পারের এই প্রত্যন্ত চরে বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলটি দুই বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে।
সীমিত সুযোগ আর দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ এক সংগ্রামী জনগোষ্ঠীকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় বুক বাঁধতে সাহসী করে তুলছে। স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়া শিশু ও তাদের অভিভাবকদের স্বপ্ন সত্যি করতে কাজ করছেন বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্যরা।
বঙ্গোপসাগরের কোলে গড়ে ওঠা জনপদে নদীবেষ্টিত চরটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং যোগাযোগব্যবস্থা, সম্পদ ও অবকাঠামোগত দিক থেকে বেশ অবহেলিত। এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্কুলটি শিশুদের শেখার এবং বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ ও আনন্দময় স্থান হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থায়ন এবং একই সঙ্গে বই, স্কুল ইউনিফর্ম, ব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ দিচ্ছে বসুন্ধরা গ্রুপ। বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
এই স্কুলটির প্রায় সব শিশু এমন পরিবার থেকে আসা, যারা জীবিকা নির্বাহের জন্য মাছ ধরা বা কৃষির ওপর নির্ভর করে। বেশির ভাগ পরিবারের কাছে শিক্ষা এখনো এক ধরনের বিলাস পণ্য।
শত প্রতিকূলতার জাল ছিন্ন করে হাড়-কাঁপানো শীতে বই উৎসবে শামিল হতে অভিভাবকদের উপস্থিতি আমাদের নতুন এক উদ্যমী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়। বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি কিছু। হার না মানা চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞার সংগ্রামী চিরায়ত বাঙালি মানসিকতার প্রতীক। চর ইমারশনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাই আমাদের টেকসই ও বহুমাত্রিক সাফল্যের আগামীর উন্নত বাংলাদেশের যোদ্ধা। জীবনের সীমাবদ্ধতার বাইরে শতাধিক নিষ্পাপ বালক-বালিকার স্বপ্নাতুর চাহনি আমাদের নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।
আমি যখন আয়োজকদের থেকে বিদায় নিয়ে পরবর্তী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য মোটরসাইকেলে চড়ে বসেছি, তখন অনেকগুলো স্বপ্ন আর একমুঠো ভালো লাগা আমার সঙ্গী। আমাদের এই পথচলা তখনই দিগন্তে মিলবে, যখন চর ইমারশনের ছেলেমেয়েদের কৃতিত্বের গল্প আগুনমুখার সীমানা ছাড়িয়ে পাড়ি দেবে অসীমের পানে।
লেখক: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, রাঙ্গাবালী, পটুয়াখালী