কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত উপজেলা কুতুবদিয়ায় রয়েছে ৫৪টি গ্রাম। এরমধ্য প্রাকৃতিক কারণে খুদিয়ারটেক নামক গ্রামটি মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হলেও বনায়নে ভরপুর ছিল। কিন্তু এখন ওই বনায়নও রক্ষণাবেক্ষণার অভাবে বিলুপ্ত হতে চলেছে।
এছাড়াও উপজেলার উত্তরচর ধূরুংসহ ৬টি ইউনিয়নের পূর্ব-পশ্চিমের কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধের বাইরে গড়ে উঠা আকাশ ছুঁই ছুঁই সারি-সারি গাছের সেই নিবিড় বনায়ন এখন শুধুই স্মৃতি আর স্মৃতি। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে বনায়নের সাথে হারিয়ে যাচ্ছে গাছে বাসা তৈরি করে অবস্থান করা হাজার হাজার পাখির কিচির-মিচির ডাকের মনোরম দৃশ্য। এসব বনায়ন ধ্বংসে কুতুবদিয়া দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই জীববৈচিত্র্য নিরাপত্তা জোরদার করতে সংশ্লিষ্টদের সঠিক উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন দ্বীপবাসী।
এদিকে, খুদিয়ারটেক ও চর ধুরুং এলাকায় বনায়ন প্রায় সম্পূর্ণ সাগর গর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়াও প্রতি বছর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। যে সকল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে বনায়ন বিলুপ্ত হয়েছে ওই সব এলাকায় বনায়নের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রফেসর (অব.) ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার নির্দেশনা পেলেই তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান কুতুবদিয়ার বন কর্মকর্তা মো. আব্দু রাজ্জাক।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতীয় সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কুতুবদিয়া উপজেলা আহবায়ক এম. শহীদুল ইসলাম বলেন, জীববৈচিত্র্য হলো পৃথিবীর জীবনের পরিবর্তনশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে। এর পেক্ষিতে কুতুবদিয়া উপকূলে জীববৈচিত্র্য ভয়ানক ভাবে হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি খরা, লবনাক্ততার আধিক্য এবং প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের কারণে জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ম্যানগ্রোভ বন উজাড়, খালবিল, নদ-নদী এবং সাগর বিভিন্ন আবর্জনাসহ প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহারে মাত্রাতিরিক্ত দূষনের শিকার। এতে সমুদ্র কেন্দ্রীক জীববৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্র হারিয়ে বিলীন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একসময়ে দ্বীপের সমুদ্র তটিনীতে মৌসুমী পাখিদের কোলাহল শোনা যেতো, বিশাল বালিয়াড়ির তীরে মা কাছিম ডিম দিতো আসতো। বর্তমানে এসবের দেখা মিলেনা। এ জন্য বন্যপ্রাণি এবং উদ্ভিদগুলির প্রতি গণসচেতনা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি নদী ও জলাভূমির সংরক্ষণ দরকার। সবুজ উৎপাদনব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রফেসর (অব.) ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কুতুবদিয়ার মানুষ আগামী দশ বছর পর বসবাস করতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে। এছাড়াও দ্বীপের চারিপাশে পর্যাপ্ত পরিমাণ বনায়ন না থাকায় আরও বেশি ক্ষতি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কুতুবদিয়ার উত্তরে বাঁশখালী গন্ডামারা ও দক্ষিণে মহেশখালী মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুত রয়েছে। এ দুই বিদ্যুতের বায়ু দুষণে কুতুবদিয়ার মানুষের ভবিষ্যত অন্ধকারে পরিণত হতে পারে। কারণ উত্তর দিকের বাতাস হলে বিদ্যুতের দুষণ গুলো কুতুবদিয়া আসবে এবং দক্ষিণ দিকে বাতাস হলে তাও দুষণ গুলো কুতুবদিয়া উপকূলে আসবে। ফলে, কুতুবদিয়া জীব বৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। একদিকে নাই বনায়ন, অন্যদিকে কয়লাবিদ্যুৎ গুলোর বায়ু দুষণের কারণে কুতুবদিয়ার মানুষের ভবিষ্যত আগামীতে অন্ধকার হবে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জমির উদ্দিন দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কুতুবদিয়ার উত্তর পাশে বাঁশখালী গন্ডামারা কয়লা বিদ্যুৎ সম্পর্কে অবগত নই। তবে তিনি মহেশখালীর মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ পরিদর্শন করেছেন। সেখানে জাপান থেকে উন্নতমানের সার্কিট বসানো হয়েছে। তাই বায়ু দূষিত হয় এমন কোনও ক্ষতিকারক কিছুই পাওয়া যায়নি। সুতরাং কুতুবদিয়া দ্বীপের মানুষের জন্য ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ