‘মরুশহর’ দুবাইয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল শুধু শিরোপা উৎসবের ম্যাচ ছিল না। ছিল প্রতিশোধ ও পুনরাবৃত্তির ম্যাচ। মরুর বুকে পুনরাবৃত্তি হয়নি নিউজিল্যান্ডের। প্রতিশোধ নিয়েছে ভারত। ২০০০ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দ্বিতীয় আসরের ফাইনালে ভারত হেরেছিল নিউজিল্যান্ডের কাছে। ২৫ বছর পর ভারত ওই হারের প্রতিশোধ নিয়েছে দুবাইয়ে। বদলা নেওয়ার ফাইনাল ভারত জিতেছে ৬ বল হাতে রেখে। দুর্দান্ত, দাপুটে ৪ উইকেটের জয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জিতেছে রোহিত শর্মার ভারত। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির নয় আসরের তিনটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, মোহাম্মদ শামীর ভারত। ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যুগ্মভাবে, ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার এবং ২০২৫ সালে তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত। গত নয় মাসে দ্বিতীয়বার আইসিসির কোনো টুর্নামেন্ট জিতল রোহিত বাহিনী। গত নভেম্বরে ব্রিজটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিল। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল সেরা রোহিতের নেতৃত্বে ভারত আইসিসির সর্বশেষ চার টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলে জিতেছে দুটি। রানার্স আপ হয়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এবং ওয়ানডে বিশ্বকাপে।
রোহিত, কোহলিদের কোচ গৌতম গম্ভীর কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম আসরেই বাজিমাত করেন চ্যাম্পিয়ন হয়ে। টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের পর দায়িত্ব ছেড়ে দেন রাহুল দ্রাবিড়। তার পরিবর্তে দায়িত্ব নেন ২০১১ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের ওপেনার গম্ভীর। ভারত আইসিসির ট্রফি জিতেছে- ১৯৮৩ ও ২০১১ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০০৭ ও ২০২৪ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ এবং ২০০২, ২০১৩ ও ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জিতেছে।
চ্যাম্পিয়নশিপের আনন্দে ভাসছে ভারতের দেড় শ কোটি জনতা। মাঠে শিরোপা উৎসবের আনন্দে উইকেট নিয়ে ভাঙরা নাচ নেচেছেন অধিনায়ক রোহিত ও কোহলি। তেরঙা পতাকা গায়ে প্রজাপাতির পাখায় ভেসে বেড়িয়েছেন বরুণ চক্রবর্তী, আইয়ার, লোকেশ রাহুলরা। তীরে এসে তরি ডোবার হতাশায় বুকভাঙা বেদনায় মাঠে সটান দাঁড়িয়েছিলেন স্যান্টনার, টুর্নামেন্ট সেরা রাচিন রবীন্দ্র, কেন উইলিয়ামসনরা। গতকালের হারে দুই যুগ ধরে আইসিসি ওয়ানডে টুর্নামেন্টের শিরোপা অধরাই রইল ব্ল্যাক ক্যাপসদের। ২০০০ সালে প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জিতেছিল ট্রান্সতাসমান পাড়ের দেশটি। ২০০৯ সালে ফাইনাল খেললেও রানার্সআপেই সন্তুষ্ট ছিল। এবার তৃতীয়বার ফাইনাল খেলল। ২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেললেও রানার্সআপেই সন্তুষ্ট ছিল নিউজিল্যান্ড। ২০২১ সালে অবশ্য ভারতকে হারিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল ব্ল্যাক ক্যাপসরা। দীর্ঘ ২৫ বছর পর এবার সুযোগ হয়েছিল ওয়ানডে ট্রফির শিরোপা উৎসবের। কিন্তু ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপেই সন্তুষ্ট থাকল।
ম্যাচসেরা রোহিত গতকাল একটি বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছেন। আহমেদাবাদে রেকর্ডের শুরু, দুবাইয়ে সেটা স্পর্শ করেন ভারতীয় অধিনায়ক। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টস হেরেছিলেন। দুবাইয়ে গতকাল টস হারেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে। গত ১৬ মাসে টানা ১২ ওয়ানডেতে টস জেতেননি রোহিত। টানা টস হেরে নাম লেখেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তির ক্রিকেটার ও অধিনায়ক ব্রায়ান লারা এবং নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক পিটার বোরেনের পাশে।
রোহিত ও বিরাট কোহলির জন্য চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালটি ছিল বিশেষ কিছু। দুই কিংবদন্তি যৌথভাবে ৯টি করে আইসিসি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেছেন। ক্রিকেট বিশ্বে যা নেই অন্য কারও। ৮টি করে ফাইনাল খেলেছেন যুবরাজ সিং ও রবীন্দ্র জাদেজা। ৭টি করে ফাইনাল খেলেছেন শ্রীলঙ্কার মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারা। আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে রোহিত প্রথম খেলেন ২০০৭ সালে টি-২০ বিশ্বকাপে এবং চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। কোহলি প্রথমবার ফাইনাল খেলেন ২০১১ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে এবং চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। এরপর দুজনে মিলে খেলেছেন ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ২০১৪ টি-২০ বিশ্বকাপ, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০২৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপ এবং গতকাল ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। ২০২৪ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ এবং ২০২৫ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপা জেতেন যৌথভাবে।
টস জিতে ব্যাটিং করে নিউজিল্যান্ড ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৫১ রান করে। টুর্নামেন্ট সেরা রাচিন ২৯ বলে ৪ চার ও এক ছক্কায় ৩৭ রান করেন। ড্যারেন মিচেল ১০১ বলে ৩ চারে ৬৩ ও মিচেল ব্রেসওয়েল ৪০ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৫৩ রানে অপরাজিত থাকেন। ২৫২ রানের টার্গেটে ভারত জয় তুলে নেয় এক ওভার আগে। ফাইনাল সেরা রোহিত ৭৬ রান করেন ৮৩ বলে ৭ চার ও এক ছক্কায়। কোহলি ১ রান করেন। ৪৭ রান করলে তিনি টপকে যেতেন ক্রিস গেইলকে। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার ৭৯১ রান করে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সবার ওপরে। উইনিং শটটি খেলেন রবীন্দ্র জাদেজা ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে। লোকেশ রাহুল অপরাজিত ছিলেন ৩৪ রানে। ৩৩ বলের ইনিংসটিতে ছিল একটি ৪ ও একটি ছক্কা। শ্রেয়াস আইয়ার ৬২ বলে ৪৮ রান করেন দুই ৪ ও ২ ছক্কায়। অক্ষর প্যাটেল ২৯ রান করেন ৪০ বলে। কিউইদের পক্ষে সান্টানার ও ব্রেসওয়েল উইকেট নেন ২টি করে।