বাংলাদেশ পুলিশ প্রায়শই দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে গাড়ি ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে অনুদান সংগ্রহ করে থাকে। পুলিশ কর্মকর্তারা আর্থিক সীমাবদ্ধতার অজুহাতে এই অর্থ সংগ্রহকে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করছেন। তবে অনুদানদাতাদের মধ্যে কিছু অপরাধমূলক রেকর্ডধারী থাকা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য পুলিশকে বাহ্যিক অর্থ সহায়তা থেকে বিরত থাকতে হবে। তারা জানান, যখন পুলিশ কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল হয়, তখন জনসাধারণের আস্থা কমে যায় এবং এটি গুরুতর নৈতিক উদ্বেগের জন্ম দেয়। দাতারা যদি সত্যিই জনহিতকর কাজে আগ্রহী হন, তাহলে তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিবর্তে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কৃষির মতো ক্ষেত্রগুলোকে সহায়তা করতে পারতেন।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেছেন, ‘পুলিশিং দায়িত্ব পালনের জন্য লজিস্টিক সহায়তা অপরিহার্য। কিন্তু বেসরকারি সংস্থার উপর নির্ভরতা সরকারের অদক্ষতার ইঙ্গিত দেয়। সরকার যদি পর্যাপ্ত তহবিল সরবরাহ করত, তাহলে বাহ্যিক অনুদান গ্রহণের প্রয়োজন হত না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে এবং পুলিশের অনুরোধের প্রতিক্রিয়ায় যানবাহন অনুদান দিয়ে থাকে। যা এই ধরনের অনুদান দাতাদের উপর মানসিক নির্ভরতা তৈরি করে।
তবে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক এবং সদর দপ্তরের মুখপাত্র এনামুল হক সাগর জোর দিয়ে বলেছেন, ‘লজিস্টিক সহায়তা গ্রহণ করা পুলিশের নিরপেক্ষতার সঙ্গে আপস করে না। সরকার প্রতি বছর পুলিশ অভিযানের জন্য অর্থায়ন করে। তবে, এটা সত্য যে কিছু সংস্থা স্বেচ্ছায় টহল যানবাহন এবং ট্রাফিক পুলিশ বক্সে অবদান রাখে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাতাদের পুলিশের দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলার কোনও সুযোগ নেই। তবে, বিতর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সহায়তা গ্রহণ করা উদ্বেগের বিষয়।’
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই ধরনের অনুদানকে ঘুষের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে তার সততা বজায় রাখার জন্য সরকারি তহবিলের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। যখন একটি পুলিশ স্টেশন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ লক্ষ টাকার গাড়ি গ্রহণ করে, তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের মানসিক অনীহা তৈরি হয়।’
তবে পুলিশ কর্মকর্তারা এমনটা মনে করেন না। তাদের মতে, যে অনুদান কেবলমাত্র সরকারের অনুমোদনের সাথেই গ্রহণ করা হয় এবং নিরপেক্ষতার বিষয়ে আপস করা হয় না। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘যদি কোনও দাতার অপরাধমূলক পটভূমি থাকে, তা আমাদের বিবেচনায় রাখা হয়।’
যদিও অতীতের ঘটনাগুলো বলছে ভিন্ন কথা। রাজবাড়ী জেলা পুলিশ ২০২১ সালে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিমের কাছ থেকে একটি গাড়ি পেয়েছিল। যিনি বর্তমানে একাধিক খুনের মামলায় ওয়ান্টেড আসামি। এর আগে, ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ জাতীয় পার্টির সাংসদ সেলিম ওসমানের কাছ থেকে একটি গাড়ি গ্রহণ করে। তার বিরুদ্ধেও ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড রয়েছে।
এছাড়া ২০২৩ সালে কক্সবাজারের একটি পুলিশ ক্যাম্প স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সরকারের প্রাক্তন সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের কাছ থেকে একটি গাড়ি নিয়েছিল। এই সংসদ সদস্যও জমি দখল এবং আর্থিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে বাহিনীর কাছে ১০ হাজার ৯৪৬টি গাড়ি ছিল কিন্তু প্রয়োজন ছিলো ১৬ হাজার ১২৪টি। এতে মোটরসাইকেলসহ মোট পাঁচ হাজার ১৭৬টিরও বেশি গাড়ির ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে জুলাই অভ্যত্থানের সময় এক হাজার ৭৪টি পুলিশ গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু পরবর্তিতে মাত্র ৪০০টি নতুন গাড়ি কেনা হয়। যার ফলে পুলিশকে ব্যক্তিগত গাড়ি অধিগ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
জানা যায়, গত ২৩ জানুয়ারি রানার গ্রুপ থেকে ডিএমপিকে পাঁচটি মোটরসাইকেল এবং একটি পিকআপ ভ্যান প্রদান করা হয়। এছাড়া অন্যান্য বেসরকারি সংস্থা- যেমন অরিক্স গ্রুপ ঢাকার ট্রাফিক পুলিশ বুথসহ পুলিশের অবকাঠামোতে অর্থায়ন করেছে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক বার্তা দিয়ে আসছেন বরাবরের মতো। তাদের মতে, ব্যক্তিগত অনুদানের উপর অব্যাহত নির্ভরতা ধনী ব্যক্তি এবং কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধাগ্রস্ত করবে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, পুলিশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পরিবর্তে অভিজাতদের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের মতো জরুরি পরিষেবার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণের অনুমতি দেওয়ার পরিবর্তে, কর্তৃপক্ষের উচিত আর্থিক সহায়তার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।’
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. জারিফ রহমান বলেন, ‘পুলিশের বাজেট কেবল বেতন-ভাতার জন্য বৃদ্ধি পেয়েছে, সরবরাহ এবং অন্যান্য খাতে নয়। আমরা পুলিশকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যানবাহন সরবরাহ করার সুপারিশ করেছি- যাতে তাদের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কোনো সংস্থার উপর নির্ভর করতে না হয়।’
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র : ডেইলি সান।