দেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম উৎস তৈরি পোশাক খাত টানা আঘাতে এখন জর্জরিত। প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলো থেকে প্রত্যাশিত অর্ডার না পাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম কমে যাওয়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্ন এবং শ্রমিক অসন্তোষসহ নানান সংকটে টালমাটাল। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের এ খাত। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে সংকট শুরু হয় করোনার সময় থেকে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে যোগ হয়েছে উচ্চ সুদের হার, শ্রমিক অসন্তোষ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের হাতে ঘোনা কয়েকটি পোশাক কারখানা ছাড়া কেউ লাভের মুখ দেখছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে ‘মৃত্যুবরণ’ করবে তৈরি পোশাক খাত।’ এমন পরিস্থিতিতে সরকার প্রতি তার পরামর্শ, ‘এ সেক্টরকে রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট করতে হবে। লোকসানে পড়া পোশাক কারখানাগুলোতে দিতে হবে বিশেষ প্রণোদনা।’
জানা যায়, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি শুরু হলে ধাক্কা খেতে থাকে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত পোশাক শিল্প। এরপর আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে লোহিত সাগর সংকট ও সংঘাত এ খাতের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এরপর গত বছরের জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্দোলন দমাতে সরকার জুলাই ও আগস্টে ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ জারি করলে সার্বিক পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে। সরকার পট পরিবর্তনের পর জ্বালানি ও ডলার সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা, শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ঢিলেঢালা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। এ ছাড়া ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাস ট্যারিফ বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না হওয়ায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে এ খাতে। একের পর এক টানা আঘাতের কারণে বিপর্যস্ত দেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম এ খাত। তৈরি পোশাক খাতে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোর পোশাকের দাম কমানো। গত এক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের দাম কমিয়েছে ৫ শতাংশ। আমেরিকার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পোশাকের দাম কমিয়েছে ৮ শতাংশ। একই সঙ্গে সার্বিকভাবে গত বছর রপ্তানি অর্ডার কমেছে ৩ শতাংশ। এতে করে চরম সংকটে পড়েছে পোশাক তৈরির কারখানা মালিকরা। লোকসান গুনতে গুনতে গত এক বছরে বন্ধ হয়েছে কমপক্ষে ৮০টি তৈরি পোশাক কারখানা। কর্মীদের সময়মতো বেতন দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শত শত কারখানাকে।