ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে (৯টা ১৫ জিএমটি) যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে সময়টা চুক্তির সময়ের চেয়ে তিন ঘণ্টা পর। চুক্তির অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার এ কথা নিশ্চিত করেছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজিদ আল-আনসারি জানান, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের তিন জিম্মিকে রেড ক্রসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁরা তিনজনই ইসরায়েলি নাগরিক এবং তিনজনই নারী। এই তিনজন হলেন, রোমি গোনেন (২৪), এমিলি দামারি (২৮) ও দোরোন স্টেইনব্রিচার (৩১)। হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসেম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবাইদা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে হামাস ওই তিন জিম্মি নামের তালিকা সময়মতো সরবরাহ না করায় যুদ্ধবিরতি পিছিয়ে দেয় ইসরায়েল।
ওই সময়ের মধ্যেই গাজায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পরে হামাস ইসরায়েলের তিনজন নারী জিম্মির নাম প্রকাশ করে। এর কিছুক্ষণ পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঘোষণা দেয়। এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রতিবাদে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী বেন গভির। তিনি উগ্র ডানপন্থি দল জিউশ পাওয়ারের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্বও করতেন। একই সময় সংসদ থেকে তার দলের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন ইয়িস্তহাক ওয়াসারলাউফ এবং এমিখাই এলিয়াহু।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়, যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। এ সময় ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস। পরে ইসরায়েল গাজায় বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু করে। ইসরায়েলী হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৮০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির মূল শর্তগুলো হলো :
১) প্রাথমিক পর্যায়ে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ছয় সপ্তাহের গাজার কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং উত্তর গাজায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা তাদের বাড়িতে ফিরতে পারবে। ২) চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির প্রতিটি দিন ৬০০ ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশে অনুমতি দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৫০টি ট্রাক হবে জ্বালানিবাহী। এর মধ্যে ৩০০টি ট্রাক উত্তর গাজায় পাঠানো হবে, কারণ সেখানকার বেসামরিক নাগরিকদের পরিস্থিতি সবচেয়ে করুণ। ৩) হামাস ৩৩ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে, যাদের মধ্যে সব নারী, শিশু এবং পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ থাকবে। হামাস প্রথমে ১৯ বছরের কম বয়সি নারী জিম্মিদের মুক্তি দেবে। ৪) ইসরায়েল প্রতিজন সাধারণ বন্দির জন্য ৩০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে এবং প্রতিটি ইসরায়েলি নারী সৈন্যের জন্য ৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। ৫) চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হামাস আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিকে জানাবে মুক্তি দেওয়া জিম্মিরা গাজার ঠিক কোন স্থানে থাকবে। এএফপি, আলজাজিরা
এরপর রেড ক্রস সেই স্থান থেকে তাদের উদ্ধার শুরু করবে। ৬) হামাস ছয় সপ্তাহের মধ্যে জিম্মিদের মুক্তি দেবে, প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে তিনজন জিম্মিকে মুক্তি দেবে এবং সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে ৩৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দেবে। সব জীবিত জিম্মিকে প্রথমে মুক্তি দেওয়া হবে, তারপরে মৃত জিম্মিদের দেহাবশেষ হস্তান্তর করা হবে।
তিন জিম্মিকে মুক্তি দিল হামাস
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের প্রথম দিনে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাস তিন ইসরায়েলি জিম্মির নাম প্রকাশের পর এবার তাদের মুক্তি দিয়ে রেডক্রসের হাতে তুলে দিয়েছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীও জিম্মিদের মুক্তি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে জানিয়েছে। ওদিকে, গতকাল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই গাজার হাজার হাজার গৃহহীন বাসিন্দা বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। এমনটিই দেখা গেছে গণমাধ্যমে আসা ছবিতে। লাইন ধরে বাড়ির পথে হাঁটতে দেখা যায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে। কেউ আবার গাড়ির কনভয়ে চড়ে বাড়ির পথে ফিরছেন।
এর আগে হামাস তিনজন ইসরায়েলি জিম্মির তালিকা প্রকাশের পরই রোববার সকাল ১১ টায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই জিম্মিদের ফেরত আনতে রেডক্রসের একটি দল দুপুরেই গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তাদের মাধ্যমেই ওই তিন ইসরায়েলি জিম্মিকে হস্তান্তর করা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হামাস বলেছে, প্রতিটি ইসরায়েলি বন্দি মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের জেল থেকে ছেড়ে দিতে হবে ৩০ জন ফিলিস্তিনিকে।
সেই হিসাবে রোবারই ৯০ ফিলিস্তিনি মুক্তি পাওয়ার কথা। তবে ইসরায়েল এখনও ফিলিস্তিনি বন্দির তালিকা প্রকাশ করেনি। ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে।