"সবার সাথে প্রেম হলেও, নদীর সাথে নয়" সর্বনাশা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারানোদের এমন বুক ফাটা আর্তনাদের চিত্র ফেনীর সোনাগাজীর উপকূলে। পানির স্রোত ও মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে পড়ায় ফেনীর সোনাগাজী উপকূলের বাসিন্দারা দিন কাটাচ্ছে আতঙ্কে। এবারের আগস্টের বন্যায় নদীর পাড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ভিটেমাটি হারিয়ে এখনো পথে নামার শঙ্কায় রয়েছে অন্তত ২শত পরিবার।
ফেনীর সোনাগাজীর অব্যাহত ভাঙনের ফলে তিন দিকে নদী বেষ্টিত ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মানচিত্র দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন আতঙ্কে অনেকে ঘর-বাড়ি রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। কেউ কেউ ভবন ভেঙে রড ও আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। শুষ্ক মৌসুমে এ অবস্থা আর বর্ষা মৌসুমে কি ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে এমন আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন উপকূলীয় জনপদের বাসিন্দারা।
চরদরবেশ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদরবেশ, আদর্শগ্রাম, পশ্চিম চরদরবেশ, কাজীর স্লুইজ গেইট, আউরার খীল জেলে পাডা সহ আলামপুর, তেল্লার ঘাট, ইতালি মার্কেট, ধনী পাড়া, চরচান্দিয়ার সাহেবের ঘাট, মোল্লার চর, পশ্চিম চরচান্দিয়া, বগদানানার আলমপৃর,আউরারখিল, চরমজলিশপুর ইউনিয়নের চরবদরপুর, কুঠির হাট কাটা খিলা, কালি মন্দির, আমিরাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর, বাদামতলী, গুচ্ছগ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ঘরবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
আকবর নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, নদীর বাঁক ধীরে ধীরে বেড়িবাঁধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে অনেক বাড়িঘর চোখের সামনে নদীতে চলে গেছে। এবারের বন্যায় ভাঙন আরও বেড়ে গেছে। বাড়ির আঙিনা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আশপাশের অন্তত ২০০ ঘরবাড়িসহ বেড়িবাঁধও রক্ষা পাবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমন ইসলাম বলেন, মানুষের ঘরবাড়ি, দোকান-পাট, মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরেই ভাঙনের হুমকিতে রয়েছেন। মুসাপুর রেগুলেটর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করে সড়ক, মানুষের ঘরবাড়ি, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা করতে হবে।
মোঃ সুমন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ঘরবাড়ি হারানোর ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয়, এই বুঝি সব ভেঙে নিয়ে গেল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলামপুর গ্রামটি বর্তমানে নদী ভাঙনের সবচেয়ে হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যেই প্রধান সড়কটি নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। মানুষের ঘরবাড়ি, দোকান-পাট, মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরেই ভাঙনের হুমকিতে রয়েছেন। মুছাপুর রেগুলেটর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করে সড়ক, মানুষের ঘরবাড়ি, মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা করতে হবে। ফেনী নদীর ভাঙন আতঙ্কে সোনাগাজী উপজেলার লোকজন নির্ঘুম রাত যাপন করছেন। নদী তীরবর্তী লোকদের আহাজারি দেখার কেউ নেই। প্রতি দিন তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে নদী ভাঙন।
উত্তর চরসাহাভিকারী এলাকার বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন বলেন, গত কয়েক বছর ভাঙলেও নদী বাড়ি থেকে ৫০-৬০ মিটার দূরে ছিল। গত ২৬ আগস্ট মুছাপুর রেগুলেটর ধসে পড়ার পর সেদিনই অন্তত পাঁচ মিটার নদীর পাড় ভেঙে যায়। পরে জোয়ার আর প্রবল স্রোতের সঙ্গে ভাঙনের আকার বাড়তি থাকে। এতে আমার দুটি বসতঘরের মধ্যে একটি তড়িঘড়ি করে সরিয়ে ফেলতে পেরেছি। আর কিছু অংশ ভাঙন হলেই পুরো ভিটেমাটি নদীগর্ভে চলে যাবে।
ফেনী জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক চরচান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সামছুউদ্দিন খোকন বলেন, মুছাপুর রেগুলেটরটির নির্মাণ কাজ ২০০৫ সাল থেকে শুরু হয়ে কাজ শেষ হয় ২০০৯ সালে। মুছাপুর ক্লোজার কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালে। ভারতীয় বন্যার পানির চাপে গত বছরের আগস্টে রেগগুলেটরটি নদীগর্ভে যায়। এতে নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়। মুছাপুর রেগুলেটরটি ভেঙে যাওয়ায় ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি নদী গর্ভে যাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে ভাঙনরোধে একটি যুগোপযোগী স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কেউই কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে জানান তিনি।
সোনাগাজী উপজেলা জামায়াতের আমীর মো. মোস্তফা বলেন, দেশের মানচিত্রে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে বাঁচাতে হলে মুছাপুর রেগুলেটর পুনঃনির্মাণ এবং ভাঙন কবলিত এলাকায় নতুন প্রকল্প দিতে হবে। তবে স্থায়ী সমাধান করতে হলে রেগুলেটরটি দ্রুত পুনঃনির্মাণ করা জরুরি।
নদী ভাঙনের সার্বিক বিষয় নিয়ে সোনাগাজীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, নদী ভাঙনের বিষয়টি আমরা প্রথম থেকেই দেখভাল করছি। পাউবোসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে বহুবার অবগত করা হয়েছে। মুছাপুর রেগুলেটর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর দুই উপজেলার বাসিন্দারাই নদী ভাঙনের কবলে পড়েছেন। আগ্রাসী নদী ভাঙনের মুখে সোনাগাজীর বাসিন্দাদের মাঝে নতুন আতঙ্ক শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিডি প্রতিদিন/এএ