১৯৪৮ সালে শহরের সার্কুলার রোডের রমেশ সুইটসের কর্ণধার রমেশ চন্দ্র ঘোষ জেলায় সর্বপ্রথম রসমঞ্জুরি তৈরি শুরু করেন। সে সময় ভারতের ওড়িশা থেকে কারিগর এনে তিনি এ মিষ্টি তৈরি করতেন। এক দশকের মধ্যেই রসমঞ্জুরির স্বাদ জেলার গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করে। ব্যক্তি উদ্যোগে গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি দেশের অন্যান্য জেলায় নিয়ে বিক্রি করেন অনেকে...
গোল গোল নরম মিষ্টি, ঘন লালচে দুধে জমে যেন ক্ষীর। এ মিষ্টি মুখে দিলেই মিলবে অদ্ভুত প্রশান্তি। রস আর অনন্য স্বাদের জন্য এ মিষ্টির নাম রসমঞ্জুরি। ভোজনরসিক যে কেউ গাইবান্ধায় এলে রসমঞ্জুরির স্বাদ পেতে চান। এটি গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। দেশ পেরিয়ে এখন বিদেশেও যাচ্ছে এটি। রসমঞ্জুরি তৈরির প্রধান উপাদান দুধ। দুধ থেকে তৈরি ছানার সঙ্গে ময়দা ও চিনির মিশ্রণে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এটি তৈরি হয়। ছোট ছোট গোলাকার ছানার তৈরি মিষ্টিতে ব্যবহার করা হয় দুধের ঘন রস। ১৯৪৮ সালে শহরের সার্কুলার রোডের রমেশ সুইটসের কর্ণধার রমেশ চন্দ্র ঘোষ জেলায় সর্বপ্রথম রসমঞ্জুরি তৈরি শুরু করেন। সে সময় ভারতের ওড়িশা থেকে কারিগর এনে তিনি এই মিষ্টি তৈরি করতেন। এক দশকের মধ্যেই রসমঞ্জুরির স্বাদ জেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশব্যাপী মানুষকে আকৃষ্ট করে। ব্যক্তি উদ্যোগে গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি দেশের অন্যান্য জেলায় নিয়ে বিক্রি করেন অনেকে। বিশেষ প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ক্রেতারা নিজের উদ্যোগেই নিয়ে যান এই মিষ্টি। রমেশ সুইটস ছাড়াও জেলায় এখন গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভান্ডার, নাড়ু মিষ্টান্ন ভান্ডার, গাইবান্ধা রসমালাই, মা মিষ্টান্ন ভান্ডারসহ বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে এই রসমঞ্জুরি মেলে। তবে সব থেকে বেশি বিক্রি হয় রমেশ সুইটস ও গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভান্ডারে। প্রতিদিন একেকটি দোকানে তৈরি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি রসমঞ্জুরি। ১ কেজি রসমঞ্জুরি তৈরিতে ৩৫০ টাকা খরচ হয় দোকানিদের। আর তারা প্রতি কেজি বিক্রি করেন ৪০০ টাকায়। কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১ কেজি রসমঞ্জুরি তৈরি করতে আড়াই কেজি দুধ, ১০০ গ্রাম চিনি, ২৫ গ্রাম ময়দা, ২০০ গ্রাম দুধের ছানা ও এলাচ লাগে। প্রথমে ছানার সঙ্গে হালকা ময়দা মিশিয়ে গুটি গুটি রসগোল্লা তৈরি করতে হয়। ছোট ছোট মার্বেল আকৃতির এই মিষ্টি দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীরের মতো ঘন করে তাতে ডোবালেই ক্ষীর-গুটি মিলে তৈরি হয় সুস্বাদু ও রসে টইটম্বুর রসমঞ্জুরি। রমেশ সুইটসের কারিগর শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘৩২ বছর থেকে রসমঞ্জুরি তৈরি করে আসছি। একসময় ৬০-৭০ জন কর্মচারী লাগত গুটি বানাতে। বর্তমানে রসমঞ্জুরির গুটির কাজ মেশিনেই হয়। তবে রসমঞ্জুরি তৈরির বাকি কাজে খুব কম সংখ্যক কর্মীতেই হয়।’ রসমঞ্জুরি খেতে আসা সদর উপজেলার কাটিহারা গ্রামের রানা আকন্দ বলেন, গাইবান্ধার যত রকমের মিষ্টির দোকান আছে, তার মধ্যে রমেশ ঘোষের দোকানের রসমঞ্জুরি পছন্দ করি। খাওয়া শেষে যাওয়ার সময় বাড়িতেও নিয়ে যাব। বগুড়া থেকে মাজেদুর রহমান গাইবান্ধায় এসেছেন অফিশিয়াল কাজে। কাজ শেষে তিনি রসমঞ্জুরি কিনতে গেছেন গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভান্ডারে। তিনি বলেন, ‘গাইবান্ধায় এলেই রসমঞ্জুরির স্বাদ নিই।’ রমেশ সুইটসের ব্যবস্থাপক শ্রী বাদল ঘোষ বলেন, ‘গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি প্রসিদ্ধ। রসমঞ্জুরির চাহিদা বাড়ছেই। এ মিষ্টি দেশের বাইরেও সুনাম কুড়িয়েছে। তবে দুধ ও চিনির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। মান ঠিক রাখতে তাই আগের তুলনায় মিষ্টির দামও বেড়েছে। গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভান্ডারের পরিচালক কাজী নাজমুল হাবিব বলেন, ‘জেলার ঐতিহ্যের কথা চিন্তা করে এ প্রতিষ্ঠানটি করা হয়। শুধু জেলায় নয়, সারা দেশসহ এই রসমঞ্জুরি আমরা বিদেশেও পাঠাচ্ছি। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে দোকানের বিক্রয় কেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে।’ গাইবান্ধা জেলাকে পরিচিত করতে রসমঞ্জুরি, মরিচ ও ভুট্টা এ তিনটি পণ্য ব্র্যান্ডিং করছে জেলা প্রশাসন। এ স্লোগানও তৈরি করা হয়েছে ‘স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরির ঘ্রাণ, চরাঞ্চলের ভুট্টা-মরিচ গাইবান্ধার প্রাণ’।