ব্রিটিশ শাসন থেকে শুরু করে জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারিভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম সরকারি ঘোষণা। ১৯৭৭ সালে মক্কা শরিফে ওআইসির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক ইসলামী শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ওআইসি এবং বিভিন্ন মুসলমান রাষ্ট্রের অর্থায়নে এশিয়ার তিনটি মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়ার সীমান্ত স্থান বর্তমানে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়ার সীমান্ত শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুর নামক স্থানে বর্তমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ইসলামী আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৮০(৩৭) পাস হয়। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে ৮টি অনুষদ, ৩৬টি বিভাগ, ১টি ইনস্টিটিউট, ১টি স্কুল, প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ১৭৫ একর আয়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে দুটি প্রশাসনিক ভবন, ছাত্রদের জন্য সাদ্দাম হোসেন হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, শহীদ জিয়াউর রহমান হল, শেখ রাসেল হল ও লালন শাহ হল নামে চারটি আবাসিক হল এবং ছাত্রীদের জন্য শেখ হাসিনা হল, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল ও বেগম খালেদা জিয়া হল নামে তিনটি আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া দুটি দশ তলা ছাত্র হল এবং একটি দশতলা ছাত্রী হল নির্মাণাধীন রয়েছে। বর্তমানে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মাদ নকীব নসরুল্লাহ।
স্বাতন্ত্র্য ধর্মতত্ত্ব অনুষদ ও আল-ফিকহ বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব অনুষদ বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক অনুষদ। এই অনুষদটি ইসলামী শিক্ষার গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগ রয়েছে। বিভাগগুলো হলো, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্য।
স্থাপত্য শিল্পের অনন্য নিদর্শন শহীদ স্মৃতিসৌধ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) যে কয়টি স্থাপত্য ও ভাস্কর্য রয়েছে তার মধ্যে শহীদ স্মৃতিসৌধ অন্যতম। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর গৌরবময় মুক্তিযোদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামের শহীদদের স্মরণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০০১ সালে তাৎপর্যপূর্ণ এ শহীদ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী হাশেম খান এবং প্রখ্যাত স্থাপত্যবিদ রবিউল ইসলামের দেওয়া মডেল ও স্থাপত্য কর্মের ভিত্তিতে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হয়। দেয়ালচিত্রে সংযোজিত বাণীগুলো হলো- ‘তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মতো বাঁচতে জানে’, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়, সেই জয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করব তারে লয়,’ পাগলা কানাইয়ের “শত রঙ্গের দেখিরে গাভী, এবা রঙ্গের দুধ গো দেখি, তবে কেন ত্রিজগতে মানবিচ করত্যাচি”, লালন ফকিরের “সব লোকে কয়-লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে”, মীর মশাররফ হোসেনের “বাংলা ভাষায় যাহার ভক্তি নাই, সে মানুষ নহে”, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি শহীদ স্মৃতিসৌধের সৌন্দর্যকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুক্ত বাংলা
শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শত্রুর বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় ভাস্কর্য রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) এমনি একটি ভাস্কর্য ‘মুক্তবাংলা’। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের অন্যতম এই স্মারক ভাস্কর্যটি আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের আঙ্গিকে ১৯৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের পূর্ব পাশে স্থাপন করা হয়। খ্যাতিমান স্থপতি রশিদ আহমেদের নকশার ভিত্তিতে এটিকে অপরূপ এক সৌন্দর্যে রূপ দেওয়া হয়। ‘মুক্তবাংলা’র সাতটি স্তম্ভ সংবলিত গম্বুজের ওপর রয়েছে দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার রাইফেল, যা সাত সদস্যের মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার প্রতীক। সর্বনিম্নে বিস্তৃত সিরামিক বড় ইট লাগাতর আন্দোলনের নির্দেশক। এছাড়া উপর থেকে চতুর্থ ধাপে লাল সিরামিক ইট আন্দোলন ও যুদ্ধের প্রতীক, দ্বিতীয় ধাপে কালো পাথর শোক ও দুঃখের প্রতীক, তৃতীয় ধাপে সাদা মোজাইক সন্ধি ও যোগাযোগের প্রতীক এবং বেদির মূল মেঝে সবুজ মোজাইক নীল টাইলস শান্তির প্রতীক। সম্পূর্ণ অবকাঠামোটি সাতটি আর্চ সংবলিত একটি অর্ধ উদিত (উদীয়মান) সূর্য।
মনোমুগ্ধকর লেক
ক্যাম্পাসের একেবারে পশ্চিমে অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশে রয়েছে একটি লেক, যার নাম মফিজ লেক। বর্তমান প্রশাসন লেকটির নতুন নাম ‘মীর মুগ্ধ সরোবর’ করার পরিকল্পনা করেছেন। খানে প্রাণের মেলা বসে। প্রেমিকরা এই লেকের ধারে বসে প্রেমিকার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। প্রেম নিবেদন করে একে অন্যকে, কখনো প্রেমিকার বেণীতে গুঁজে দেন প্রেমের ফুল। আর শিক্ষার্থীরা এখানে এসে প্রাণ খুলে গান গায়, আড্ডা দেয়। শীত মৌসুমে এই লেকের দুই ধারে ফুটে সাদা কাশফুল ও হরেকরকমের বন্য ফুল। এছাড়া সুদূর সাইবেরিয়া থেকে অতিথি পাখি এসে লেকের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
নান্দনিক কেন্দ্রীয় মসজিদ
বাংলাদেশে স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ অন্যতম। মসজিদটিতে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন ১৭ হাজার মুসল্লি। চারতলা বিশিষ্ট মসজিদের নিচতলায় মহিলাদের নামাজের স্থান রয়েছে। দেশের প্রাতিষ্ঠানিকভিত্তিক মসজিদগুলোর মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে এশিয়া মহাদেশের সৌন্দর্যতম মসজিদগুলোর একটি হবে এটি। চারতলা বিশিষ্ট বর্গাকৃতির মসজিদটি সিরামিক ও শ্বেতপাথরে নির্মিত। সূর্যের আলোয় দিনের বেলায় মসজিদটির গা থেকে যেন উজ্জ্বল আভা ছড়ায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুই দশমিক ২৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে নির্মাণকাজ চলছে মসজিদটির। মসজিদের গ্রাউন্ড ফ্লোরের আয়তন ৫১ হাজার বর্গফুট। চারতলার মূল মসজিদে মোট সাত হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন। এছাড়া মসজিদের সামনের পেডমেন্টে নামাজ পড়তে পারবে আরও ১০ হাজার মুসল্লি। প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, অনন্য স্থাপত্যকর্ম মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। সরকারি অর্থায়নে কাজ শুরু হলেও পরে সহায়তা আসে বিদেশ থেকেও। তবে মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা ভিন্ন খাতে ব্যয় করায় ও সঠিকভাবে কাজে না লাগানোয় অর্থ ফেরতও নেয় বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ফলে দীর্ঘ ২৬ বছরে মাত্র ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পর ২০০৪ সালে ৩৬ শতাংশ কাজ শেষ হলে তৎকালীন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মোশারেফ হোসাইন শাহজাহান উদ্বোধনের মাধ্যমে নামাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেন মসজিদটি। মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে এখনো ৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন। তবে বরাদ্দ না থাকায় নির্মাণ কাজ চলছে না।
ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য
অর্থনীতি বিভাগের আশিকুর রহমান খান এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র আলিমুজ্জামান কানন ২০১২ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ এশিয়ান হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা ও ২০১৪ সালে চীনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব যুব হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের হয়ে অংশগ্রহণ করেন। চীনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় ইইই বিভাগের ছাত্র সালভি বাংলাদেশ দলের হয়ে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৮ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে ইবির ছয়জন অ্যাথলেট বাংলাদেশ দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সদ্য সমাপ্ত ‘বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমস-২০২০’ এ অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে কয়েকটি স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। ‘বঙ্গবন্ধু স্পোর্টস চ্যাম্প-২০১৯’ এ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সর্বমোট ৫৬ পয়েন্ট পেয়ে দলগতভাবে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং উক্ত প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী আনিকা রহমান তামান্না ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়ে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
ডায়না চত্বর
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে প্রশাসনিক ভবনের সামনেই এ ডায়না চত্বর। এ চত্বরের বিশালত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল আলবেজিয়াছগাছ ও গয়নার মতো চত্বরটাকে ঘিরে থাকে সোনালু গাছ। প্রিন্সেস ডায়না যে বছর মারা যান, তখন থেকেই চত্বরটির নাম হয় ডায়না চত্বর। অনেকগুলো আড্ডার জায়গা থাকলেও এটাই যেন তাঁদের কাছে আড্ডার প্রাণকেন্দ্র-আড্ডায়, হাসিতে মুখর ডায়না চত্বর।