চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিজস্ব অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মেজবান, স্থানীয়ভাবে যা মেজ্জান নামেই বেশি পরিচিত। সাধারণত মেজবান বলতে বোঝায় ভোজের আয়োজন, যেখানে প্রচুর অতিথির সমাগম ঘটে এবং খাবারে আধিক্য থাকে গরুর মাংসের। নানা উপলক্ষে মেজবানের আয়োজন হয়ে থাকে। সেটি কোনো শুভ বা আনন্দের উপলক্ষ হতে পারে। আবার হতে পারে সামাজিক বা ধর্মীয় কোনো আচার-অনুষ্ঠানও। চট্টগ্রামের হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে নিয়মিতই মেজবানের আয়োজন করা হচ্ছে। যে কোনো হোটেলে ঢুকে খেয়ে নেওয়া যায় মেজবানি। ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় হোটেলগুলোতে মেজবানির বিশেষ প্যাকেজ বিক্রি হয়।
বহু বছর আগে থেকে চট্টগ্রামে চালু রয়েছে সাদা ভাত-গরুর মাংসের মেজবান, যা এখনো এখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে সগৌরবে টিকে আছে। মেজবান সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। বিভিন্ন উপলক্ষে ধনী-গরিব সাধ্যমতো ভোজের আয়োজন করে থাকেন। সাধারণত ৪-৫শ থেকে শুরু করে থাকে কয়েক হাজার অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা। এখানকার মানুষ মেজবানের জন্য মুখিয়ে থাকেন। দাওয়াত পেলেই ছুটে যান সপরিবারে। সামর্থ্যবানরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াও বছরে একবার পারিবারিক মেজবানের আয়োজন করে থাকেন। তাতে নিকটাত্মীয় ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশ নেন। এ ধরনের মেজবান এক ধরনের পারিবারিক উৎসবে পরিণত হয়। মেজবান উপলক্ষে বাড়ির মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে নাইওর আনার প্রচলন রয়েছে। অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে থেকেই নিকটাত্মীয়রা এসে উপস্থিত হন। পুরো বাড়িতে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাবারের আয়োজন করতে হয় বিধায় মেজবানের আয়োজন বেশ ব্যয়বহুল। সচ্ছল ব্যক্তিদের পরিবারে তাই মেজবানের প্রচলন বেশি। চট্টগ্রাম সুদূর অতীতকাল থেকেই ব্যবসাবাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। সমুদ্রবন্দর ঘিরে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কারণে এ এলাকায় আগে সওদাগরের সংখ্যাধিক্য ছিল। তারা মেজবানসহ সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে প্রচুর অর্থ খরচ করতেন। কালের বিবর্তনে সওদাগরি ব্যবসার ধরন পাল্টালেও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় এ এলাকায় ধনাঢ্য ব্যক্তির সংখ্যা প্রচুর। নিজ বাড়ির আঙিনা কিংবা কোনো কমিউনিটি সেন্টারে বড় আকারের মেজবানের আয়োজন করতে প্রায়ই দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ হাজার মানুষকে খাওয়ানো হয়। মেজবানের কিছু বিশেষ দিক রয়েছে। যেমন এ ধরনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক উদার থাকেন আয়োজকরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমন্ত্রণপত্র ছাড়াই দাওয়াত দেওয়া হয়। যাকে গণদাওয়াত বলা যেতে পারে। যেমন কোনো গ্রামে কেউ মেজবান আয়োজন করলে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে এলাকার সবার কাছে দাওয়াত পৌঁছানো হয়। কেউ সরাসরি আমন্ত্রণ পেয়ে আসেন আবার আমন্ত্রণ ছাড়া অন্যের কাছ থেকে শুনেও চলে আসেন অনেকে। এক্ষেত্রে অতিথিদের সবাইকেই সম্মানের চোখে দেখা হয়। একই খাবার পরিবেশন করা হয় সবাইকে। আদর-আপ্যায়নের কোনো কমতি থাকে না। এই অঞ্চলে আগে মেজবানির দাওয়াত হাটবাজারে ঢোল পিটিয়ে বা টিনের চুঙ্গি ফুঁকে প্রচার করা হতো আর সে খবর লোকমুখে পাড়া-মহল্লার ঘরে ঘরে পৌঁছে যেত এবং নির্দিষ্ট দিনক্ষণে হাজির হয়ে ছেলে বুড়ো সবাই মেজবানির খাবার খেত।
মেজবানের খাবার : মেজবানের মূল উপকরণ সাদা ভাত ও গরুর মাংস। সঙ্গে থাকে গরুর হাড়-চর্বি দিয়ে রান্না করা চনার ডাল ও নলার ঝোল। আগে মাসকলাইয়ের ডাল থাকত। এখন এ ডালের তেমন চাষ হয় না। তাই চনার ডাল রান্না করা হয়। অনেকে গরুর কালো ভুনারও আয়োজন করে থাকেন। চট্টগ্রামের মেজবানির মাংসের ব্যতিক্রমী স্বাদ ও ঘ্রাণ অন্য কোথাও রান্নায় পাওয়া যায় না। সবার পক্ষে এই মাংস রান্না সম্ভবও হয় না। দীর্ঘ অভিজ্ঞ বাবুর্চিরাই কেবল মেজবানের মাংসের আসল স্বাদ আনতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বাবুর্চিরা বহু পদের মসলা ব্যবহার করেন। অনেকের গোপন রেসিপিও থাকে। গ্যাসের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় মাটি বা ইটের অস্থায়ী চুলা এবং লাকড়ি। বেশি আঁচে দুই তিন-ঘণ্টা রান্নার পর চুলা থেকে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করা হয়। মেজবান রান্নায় সিদ্ধহস্ত বাবুর্চিদের একজন হাজি হাবিবুর রহমান জানান, মরহুম হাজি জামাল বাবুর্চি ও রশিদ বাবুর্চির এ রান্নায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। বড় বড় অনুষ্ঠানে তারাই রান্না করতেন। এই মাপের পুরনো নামকরা বাবুুর্চিদের কাছ থেকে শিখে এসে যারা মেজবান রান্না করছেন, তাদের রান্নাতেই কেবল প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়।
মেজবানের ইতিহাস : মেজবানের শুরু কখন থেকে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ১৫শ শতকের কবি বিজয় গুপ্তের পদ্মপুরাণ কাব্যগ্রন্থে এ মেজবানের তথ্য মেলে। ১৬শ শতাব্দীর সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ কাব্যগ্রন্থে ‘মেজোয়ানি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ভোজনার্থে। প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে মেজোয়ানি ও মেজবান শব্দ দুটি পাওয়া যায়। মেজবান ফার্সি শব্দ। মেজবান শব্দটির অর্থ অতিথি আপ্যায়ন, আতিথেয়তা বা মেহেমানদারি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মেজবানকে বলা হয় ‘মেজ্জানি’। চট্টগ্রামের বাইরে অন্য জেলায় একে বলা হয় ‘জেয়াফত’। মেজবান সাধারণত কারও মৃত্যুবার্ষিকী, কুলখানি, চল্লিশা, ওরস, মিলাদ মাহফিল, আকিকা, গায়ে হলুদ, বিয়ে, নতুন বাড়িতে ওঠা, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু তথা কোনো কাজের শুভ সূচনার সময় আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রামের বাইরে নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় মেজবান বা জেয়াফতের ঐতিহ্য রয়েছে।