পাঠ্যবই থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি বাদ দেওয়া ও প্রতিবাদরত আদিবাসীদের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ৪৬ জন নাগরিক বিবৃতি দিয়েছেন। পাশাপাশি ছয়টি দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে- অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। যারা পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতি সরিয়েছেন তারা তার অবস্থান ও অঙ্গীকারকে অসম্মান করেছেন বলে আমরা মনে করি। আমরা বিশ্বাস করতে চাই বৈষম্যবিরোধী এ সরকার বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতি বহাল রাখবে।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্বরোচিত হামলার দায় এবং জবাবদিহির দায়িত্ব আইনশৃক্সক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তাদের ওপরওয়ালা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টসহ পদস্থ কর্মকর্তারাও এড়াতে পারেন না। কোনো একটি সংগঠনের ব্যানারে একদল সন্ত্রাসী আদিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের মুখে সম্প্রতি নবম-দশম শ্রেণির দুটি পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সনে থাকা ‘আদিবাসী’ শব্দযুক্ত গ্রাফিতি সরিয়ে নতুন গ্রাফিতির ছবি যুক্ত করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) একটি অগ্রহণযোগ্য ও অনৈতিক কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ওই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দাবি ছিল, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নেই, তাই এই শব্দ প্রত্যাহার করতে হবে। তাদের এই অমূলক দাবির পর এনসিটিবির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে এরকম একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। এ ঘটনাটি কোনো বিশেষ মহলের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে কোনো গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যমূলক বিক্ষোভের অজুহাতে দায়িত্বশীল সরকারি সিদ্ধান্ত রাতারাতি বদলানোর এমন নিকৃষ্ট দৃষ্টান্তের সঙ্গে জড়িতদের আমরা ধিক্কার জানাই। এ দেশে কোনো ব্যক্তি যত বড় দায়িত্বশীল পদেই থাকুন না কেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যত প্রভাবশালী হোন না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে নয়, জনগণের কাছে জবাবদিহির বাইরে কারও অবস্থান নেই।
বিবৃতিতে যেসব দাবি করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক (এনসিটিবি) কার্যালয়ের কাছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদরত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণের দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত করে এ হামলার সঙ্গে যুক্ত সব সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দিতে হবে। হামলায় আহত সব আদিবাসী শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের সুচিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে সুনিশ্চিত করতে হবে। হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পেছনে কোনো বিশেষ মদতদাতা গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল কি না তাও দ্রুত শনাক্ত করে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিতসহ জড়িতদের আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসীদের যথাযথ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত অধ্যায় যুক্ত করতে হবে। আদিবাসী শব্দযুক্ত যে গ্রাফিতি প্রত্যাহার করে ছাত্র-জনতার জুলাই অভু্যুত্থানকে কার্যত অসম্মানিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে তার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অভ্যুত্থানের মূল নায়ক ছাত্র-জনতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে এবং প্রত্যাহৃত গ্রাফিতি যথা স্থানে যথা মর্যাদায় পুনর্¯’াপন করতে হবে। স্বঘোষিত হামলাকারীদের পূর্বপরিকল্পিত হামলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর সদস্যরা কেন নীরব ছিলেন বা ব্যর্থ হলেন তার সুস্পষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দেশবাসীকে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, ড. ইফতেখারুজ্জামান, রাশেদা কে চৌধুরী, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, ড. শহিদুল আলম, তাসলিমা ইসলাম, সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সুব্রত চৌধুরী, রুবায়েত ফেরদৌস প্রমুখ।